চা বিক্রেতার মেয়ের উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নিলেন চট্টগ্রামের ডিসি

অর্থাভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি নিয়ে অনিশ্চয়তায় থাকা এক চা বিক্রেতার মেয়ের উচ্চশিক্ষার দায়িত্ব নিয়েছেন চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম। একই সঙ্গে চিকিৎসার অর্থের অভাবে বিপাকে পড়া এক বীর মুক্তিযোদ্ধাসহ অসহায় ও বিপন্ন মানুষের বিভিন্ন সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধানে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিয়েছেন তিনি।
বুধবার (২৪ জুন) চট্টগ্রাম জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত সাপ্তাহিক গণশুনানিতে জেলার বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা সেবাপ্রত্যাশীরা তাঁদের সমস্যা ও আবেদন তুলে ধরেন। এছাড়া সৌদি আরব, সংযুক্ত আরব আমিরাত ও যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত কয়েকজন প্রবাসী অনলাইনে যুক্ত হয়ে বিভিন্ন অভিযোগ ও আবেদন জানান। গণশুনানিতে সভাপতিত্ব করেন জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম।
গণশুনানিতে বোয়ালখালীর উত্তর চরণদণ্ডী এলাকার এক শিক্ষার্থী জানান, তিনি ২০২৫–২৬ শিক্ষাবর্ষে বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের হিসাববিজ্ঞান বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেয়েছেন। তাঁর বাবা শাহ আলম একজন ক্ষুদ্র চা বিক্রেতা। পরিবারের সীমিত আয়ের কারণে ভর্তি ফি ও অন্যান্য ব্যয় বহন করা তাঁদের পক্ষে সম্ভব হচ্ছিল না।
তিনি আরও জানান, গত বছরও রাঙামাটি বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পেলেও মাত্র ১০ হাজার টাকার অভাবে ভর্তি হতে পারেননি। এবারও একই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে জেলা প্রশাসকের সহযোগিতা কামনা করেন।
বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক শিক্ষার্থীর উচ্চশিক্ষার সম্পূর্ণ দায়িত্ব নেওয়ার আশ্বাস দেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার ব্যবস্থা করতে সংশ্লিষ্টদের নির্দেশ দেন। জেলা প্রশাসকের এ মানবিক উদ্যোগে আবেগাপ্লুত হয়ে ওই শিক্ষার্থী বলেন, মানুষের মুখে তাঁকে ‘মানবিক জেলা প্রশাসক’ হিসেবে শুনেছিলেন, আজ নিজের জীবনে তার বাস্তব প্রমাণ পেলেন।
গণশুনানিতে পটিয়া উপজেলার ধলঘাট এলাকার বীর মুক্তিযোদ্ধা তপন দস্তিদার চিকিৎসা সহায়তার আবেদন জানান। দীর্ঘদিন ধরে হৃদরোগ, কিডনিতে পাথর ও ডায়াবেটিসে ভুগছেন তিনি। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক জরুরি ভিত্তিতে হার্টে রিং
বসানোর পরামর্শ দিলেও অর্থাভাবে চিকিৎসা করাতে পারছেন না। বিষয়টি শুনে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
এ ছাড়া প্রতিবন্ধী নারী সানজিদা চৌধুরী স্তনের লাম্প অপারেশনের জন্য আর্থিক সহায়তা চান। স্ট্রোকে আক্রান্ত ছানোয়ারা বেগম চিকিৎসা ব্যয় বহনে অক্ষমতার কথা জানান। স্বামীর পরিত্যাগের শিকার নুরুন্নাহার বেগম জীবিকা নির্বাহে সহায়তা প্রার্থনা করেন। দীর্ঘদিন ধরে ব্রেইন স্ট্রোকে আক্রান্ত আবুল বশর মোহাম্মদ গোলাম রব্বানী নিয়মিত স্পিচ থেরাপি চালিয়ে যেতে না পারার বিষয়টি তুলে ধরেন।
এছাড়া মাদ্রাসা শিক্ষক মাওলানা হাফেজ মোহাম্মদ ইদ্রিছ জরাজীর্ণ বসতবাড়ি সংস্কারের জন্য এবং সাবেক হিফজখানার শিক্ষক হাফেজ মোহাম্মদ আবুল হোসেন জীবিকা নির্বাহের জন্য ছোট ব্যবসা শুরু করতে আর্থিক সহায়তা কামনা করেন।

অনলাইনে যুক্ত হয়ে সৌদি আরবপ্রবাসী মো. শওকত মিয়া তাঁর আমানত রাখা ১ লাখ ৫০ হাজার সৌদি রিয়াল আত্মসাতের অভিযোগ করেন। সংযুক্ত আরব আমিরাতপ্রবাসী মোহাম্মদ আবুল কালাম পৈতৃক সম্পত্তি নিয়ে বিরোধ ও পরিবারের সদস্যদের হুমকির অভিযোগ জানান। একই দেশ থেকে যুক্ত হওয়া মোহাম্মদ হোসেন বকেয়া বেতন না পাওয়ার বিষয়টি তুলে ধরেন। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রপ্রবাসী মোরশেদ পারভেজ পারিবারিক কবরস্থান নির্মাণের জন্য একটি আংশিক ভরাট পুকুর সম্পূর্ণ ভরাটের অনুমতি চান।
গণশুনানিতে উপস্থাপিত প্রতিটি আবেদন মনোযোগ দিয়ে শুনে জেলা প্রশাসক সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দেন। পাশাপাশি মানবিক সহায়তার আবেদনগুলো দ্রুত যাচাই-বাছাই করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ দেন।
চট্টগ্রামে দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে নিয়মিত গণশুনানির মাধ্যমে প্রবাসীসহ সাধারণ মানুষের সমস্যা শুনে তাৎক্ষণিক সমাধানের উদ্যোগ নেওয়ায় জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম স্থানীয় মানুষের কাছে ইতোমধ্যে ‘মানবিক ডিসি’ হিসেবে ব্যাপক পরিচিতি পেয়েছেন।
ওএফ



