তিতুমীরের শিক্ষার্থীদের ভাবনায় কাজী নজরুল ইসলাম

আজ ১১ই জৈষ্ঠ্য, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। দারিদ্র্য, শোষণ ও অন্যায়ের বিরুদ্ধে সংগ্রামের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠা মহান কবি নজরুল আজও বাঙালির চেতনায় বিদ্রোহ ও সাম্যের প্রতীক হয়ে আছেন।
নজরুল শুধু একজন কবি নন; তিনি ছিলেন সাহিত্যিক, সংগীতজ্ঞ, সাংবাদিক, নাট্যকার এবং মানবতার কণ্ঠস্বর।তাঁর প্রতিটি লেখনী অত্যাচার ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে ছিল এক প্রতিবাদী উচ্চারণ। জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকী উপলক্ষে সরকারি তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা তাঁর জীবন, সাহিত্য ও আদর্শ নিয়ে নিজেদের অনুভূতি ও ভাবনা প্রকাশ করেছেন।
ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগের শিক্ষার্থী রিমা আক্তার জানান, আজ জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম এর জন্মদিন। আমার কাছে এই দিনটি শুধু একজন কবির জন্মস্মরণ নয়; এটি বিদ্রোহ, সাম্য, মুক্তচিন্তা ও মানবতার এক অনন্ত আহ্বানকে স্মরণ করার দিন।নজরুল তাঁর কবিতা, গান ও লেখনীর মাধ্যমে সাম্য, মানবতা ও ধর্মীয় সম্প্রীতির বার্তা ছড়িয়ে দিয়েছেন। তিনি ছিলেন হিন্দু-মুসলিম ঐক্যের প্রতীক। তাঁর বিখ্যাত সেই উচ্চারণ আজও আমাদের হৃদয়ে অনুরণিত হয়—
“গাহি সাম্যের গান
মানুষের চেয়ে বড় কিছু নাই, নহে কিছু মহীয়ান।”
ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী মো: মুয়াজ ইবনে জামান জানান, কাজী নজরুল ইসলাম বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের একজন সূর্যসন্তান। আমি মনে করি, তিনি শুধু বিদ্রোহের কবি নন; তিনি মানবতা, সাম্য, প্রেম ও অসাম্প্রদায়িক চেতনার এক অনন্য কণ্ঠস্বর। একজন সাহিত্যের ছাত্র হিসেবে আমি বিশ্বাস করি, নজরুলের সাহিত্য আজও আমাদের অন্যায়ের বিরুদ্ধে কথা বলতে, মানবিক হতে এবং চিন্তার স্বাধীনতা লালন করতে শেখায়। তাঁর কবিতা, গান ও প্রবন্ধে যেমন প্রতিবাদের ভাষা রয়েছে, তেমনি রয়েছে মানুষের প্রতি গভীর ভালোবাসা ও সাম্যের আহ্বান।
নজরুল তাঁর লেখনীর মাধ্যমে সমাজের শোষণ, বৈষম্য ও কুসংস্কারের বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়েছিলেন। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন, সাহিত্যের শক্তি কিভাবে অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদে রূপ নিতে পারে। তাঁর সাহিত্য কেবল অতীতের ইতিহাস নয়, বর্তমান সমাজেরও প্রেরণা বলে আমি মনে করি।
আজকের সময়ে যখন সমাজে বিভেদ, হিংসা ও অসহিষ্ণুতা বেড়ে চলেছে, তখন নজরুলের আদর্শ নতুন করে আমাদের পথ দেখায়। তাঁর অসাম্প্রদায়িক চেতনা এবং মানবতার বাণী আজও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক।
সমাজবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী নাফিজা আক্তার জেরিন জানান, কাজী নজরুল ইসলাম শুধু একজন কবি নন; তিনি ছিলেন মানবতা, সাম্য ও সাহসের এক উজ্জ্বল প্রতীক। আমি মনে করি, ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে মানুষের সমান অধিকারে তাঁর বিশ্বাস আজও আমাদের সমাজকে আলোকিত করে। তাঁর লেখা এখনো মানুষকে অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে এবং মানবতার পথে চলতে অনুপ্রেরণা দেয়।
নজরুল তাঁর সাহিত্যকর্মে নারীকে দেখেছেন শক্তি, সৌন্দর্য ও মানবতার প্রতীক হিসেবে। তিনি নারীর মুক্তি, শিক্ষা ও সমান অধিকারের পক্ষে দৃঢ়ভাবে লিখেছেন। তাঁর সাহিত্য নারীর প্রতি সমাজের আরোপিত শৃঙ্খল ভাঙার আহ্বান জানায়। আমি বিশ্বাস করি, নজরুল নারীকে কখনো গৃহের চার দেয়ালে সীমাবদ্ধ ভাবেননি; বরং সমাজ ও জাতির অগ্রগতির মূল চালিকা শক্তি হিসেবে দেখেছেন।
তাঁর বিখ্যাত “নারী” কবিতায় তিনি লিখেছেন—
“বিশ্বে যা কিছু মহান সৃষ্টি চিরকল্যাণকর,
অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।”
আবার তিনি নারীর শক্তি ও সাহসকে তুলে ধরে বলেছেন—
“নারী তুমি শুধু শাশ্বতী নও,
শক্তি, সাহস, প্রেমের অগ্নি।”
উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী মো: বাইজিদ হোসেন জানান, কাজী নজরুল ইসলাম ছিলেন প্রেম ও দ্রোহের কবি।আমি মনে করি, তাঁর কবিতার প্রতিটি পঙক্তিতেই সাহস, মানবতা ও ভালোবাসার এক অনন্য শক্তি প্রকাশ পেয়েছে।
তাঁর বিখ্যাত চরণ—
“মম এক হাতে মোর বাঁকা বাঁশের বাঁশরী,
আর এক হাতে রণতূর্য”
এই কয়েকটি লাইনের মধ্যেই যেন নজরুলের পুরো সত্তা ফুটে উঠেছে। এক হাতে তিনি প্রেম, সৌন্দর্য, সুর ও মানবতার কথা বলেছেন, আর অন্য হাতে অন্যায়ের বিরুদ্ধে তুলেছেন বিদ্রোহের ধ্বনি। আমি বিশ্বাস করি, নজরুল এমন একজন কবি, যিনি কোমলতা ও সাহস—দুই শক্তিকেই একসঙ্গে ধারণ করেছিলেন। তাঁর কলমে যেমন ছিল প্রেমের আবেগ, ঠিক তেমনি ছিল অত্যাচার, শোষণ ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিবাদ।
ওএফ



