আজ ৫৯ বছরে পা রাখল সরকারি তিতুমীর কলেজ

তিতুমীর কলেজ প্রতিনিধি: আজ ৭ মে, শিক্ষার্থী সংখ্যার দিক দিয়ে বাংলাদেশের সর্ববৃহৎ কলেজ সরকারি তিতুমীর কলেজ ৫৯ বছরে পা রাখল। ১৯৫৮ সালের এই দিনে প্রতিষ্ঠা হয়েছিল প্রতিষ্ঠানটি। প্রতিষ্ঠার সময় কলেজটি ‘জিন্নাহ কলেজ’ নামে পরিচিত ছিলো। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের পর দেশ স্বাধীন হলে কলেজটির নাম পরিবর্তন করে উপমহাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে শহীদ হওয়া বীর সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীরের নামে নামকরণ করা হয়।
১১ একরের সুবিস্তীর্ণ জায়গায় হাজারো শিক্ষার্থীদের পদচারণায় মুখরিত এই প্রতিষ্ঠান ঢাকার মহাখালী এলাকায় অবস্থিত। ৭১-এর মহান মুক্তিযুদ্ধ, ’৯০-এর স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন, ’২৪-এর বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনসহ সব গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামে এ কলেজের শিক্ষার্থীদের অবদান অনস্বীকার্য। এ কলেজের কৃতী, মেধাবী ও যশস্বী শিক্ষার্থীদের অনেকেই আজ স্বনামখ্যাত। এর মধ্য দিয়ে তাঁরা কলেজকেও করেছেন গৌরবান্বিত।
প্রতিষ্ঠার শুরুতে শুধুমাত্র উচ্চমাধ্যমিক শ্রেণির শিক্ষা কার্যক্রম চালু থাকলেও সময়ের সঙ্গে বিস্তৃত হয়েছে কলেজটির পরিধি। ১৯৯২ সালে জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত হয় প্রতিষ্ঠানটি। পরে ২০১৭ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধিভুক্ত সাত কলেজের অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে ২০২৫ সালে সেই অধিভুক্তি বাতিল করা হয় এবং পরবর্তীতে ঢাকার ঐতিহ্যবাহী সাতটি কলেজকে নিয়ে ‘ঢাকা কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়’ প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে।
ইতিহাসের পাতা থেকে জানা যায়, তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের গভর্নর মোনায়েম খান জগন্নাথ কলেজের ছাত্র আন্দোলনকে নির্মূল করার জন্য মহাখালীতে অবস্থিত ডিআইটি খাদ্যগুদাম হিসেবে পরিচিত ভবনে জগন্নাথ কলেজের ডিগ্রি শাখা স্থানান্তর করেন। এর নামকরণ করা হয় জিন্নাহ কলেজ। পরে ১৯৭১ সালের ১ মার্চ পাকিস্তানের সামরিক জান্তা ইয়াহিয়া খান রেডিও-টেলিভিশনে এক ভাষণে জাতীয় পরিষদ স্থগিত ঘোষণা করার সঙ্গে সঙ্গে জিন্নাহ কলেজ শাখার ছাত্র সংসদের প্রথম সহ-সভাপতি (ভিপি) সিরাজউদ্দৌলার নেতৃত্বে টিপু মুনশি ও শাহাবুদ্দিনসহ তৎকালীন কয়েকজন ছাত্রনেতা প্রতিক্রিয়া হিসেবে জিন্নাহ কলেজের সাইনবোর্ড ভেঙে ফেলেন। তখন আনিসুজ্জামান খোকন (জিন্নাহ কলেজের ছাত্র সংসদের সাধারণ সম্পাদক) জিন্নাহ কলেজের নাম ‘তিতুমীর কলেজ’ প্রস্তাব করেন এবং তার আরেক সহযোদ্ধা ‘সূর্যসেন কলেজ’ নাম প্রস্তাব করেন।
২ মার্চ ছাত্রলীগের কর্মীরা মিছিল করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় জড়ো হয়ে সেখানে তৎকালীন ডাকসু ভিপি আ স ম আবদুর রবকে বিষয়টা অবহিত করলে তিনি বলেন, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জিন্নাহ হল’ এর নাম পরিবর্তন করে ইতিমধ্যে ‘সূর্যসেন হল’ রাখা হয়েছে। তাই তার পরামর্শক্রমে অবশেষে জিন্নাহ কলেজের নাম ‘তিতুমীর কলেজ’ হিসেবে চূড়ান্ত হয়। ওই রাতেই ‘তিতুমীর কলেজ’ নামকরণের সাইনবোর্ড লেখা হয় এবং দেয়ালে টানিয়ে দেওয়া হয়। এলাকার কিছু যুবকও কলেজের নাম ‘তিতুমীর’ করার ব্যাপারে সার্বিক সহযোগিতা করেন।
বর্তমানে কলেজটিতে কলা ও সামাজিক বিজ্ঞান, বিজ্ঞান এবং ব্যবসায় শিক্ষা—এই তিন অনুষদের অধীনে মোট ২২টি বিভাগে স্নাতক (সম্মান) ও স্নাতকোত্তর পর্যায়ের শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
শিক্ষার্থীদের আবাসনের জন্য রয়েছে পাঁচটি পৃথক হল। পাশাপাশি যাতায়াত সুবিধায় চালু রয়েছে একাধিকবাস সার্ভিস: বিআরটিসি বাস, সম্পর্ক, অগ্নিবীণা, সোনার তরী, চলন্তিকা, সৌহার্দ্য, মতিউর রহমান ও অনিন্দ্য।
বর্তমানে কলেজটির অধ্যক্ষ হিসেবে প্রফেসর ড. ছদরুদ্দীন আহমদ এবং উপাধ্যক্ষ হিসেবে অধ্যাপক আলেয়া আকতার দায়িত্ব পালন করছেন।
মাইলস্টোন স্কুল অ্যান্ড কলেজের বিমান দুর্ঘটনায় অসংখ্য শিক্ষার্থীর জীবন বাঁচিয়ে চিরবিদায় নেওয়া শিক্ষিকা মেহরিন চৌধুরী, বিগত আওয়ামী লীগের সরকারের বাণিজ্যমন্ত্রী টিপু মুনশি, বীর মুক্তিযোদ্ধা কামাল উদ্দিন আহমেদ, মৌলভীবাজারের কুলাউড়া উপজেলা সাবেক সংসদ সদস্য এম এম শাহীন, গীতিকার ও সাংবাদিক রবিউল ইসলাম জীবন, অভিনেতা শতাব্দী ওয়াদুদ, হাসান মাসুদ, জিয়াউল হক পলাশ, শবনম বুবলীসহ অসংখ্য কৃতি শিক্ষার্থীদের চারণভূমি ছিল ৫৮ বছর বয়সী সরকারি তিতুমীর কলেজ।
শিক্ষা, ঐতিহ্য ও আন্দোলনের গৌরবগাঁথা নিয়ে ৫৯ বছরে পা রাখা সরকারি তিতুমীর কলেজ দেশের উচ্চশিক্ষা অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে চলেছে।
ওএফ



