ইতিহাসের মহানায়ক শহীদ তিতুমীরের জন্মবার্ষিকী আজ

ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে অস্ত্র ধারণ করে শাহাদাত বরণ কারী ও ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীরের ২৪৪তম জন্মবার্ষিকী আজ।
ইতিহাসের মহানায়ক শহীদ তিতুমীর বিবিসির জরিপে সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ ২০ জন বাঙালির তালিকায় ১১ নম্বরে জায়গা করে নিয়েছেন।
সৈয়দ মীর নিসার আলী তিতুমীর ১৭৮২ সালের ২৭ জানুয়ারি তৎকালীন বাংলার চব্বিশ পরগণা জেলার বশিরহাট মহকুমার চাঁদপুর গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা সৈয়দ মীর হাসান আলী এবং মাতা আবিদা রোকেয়া খাতুন। পারিবারিকভাবে তারা নিজেদের হযরত আলী (রাঃ)-এর বংশধর বলে দাবি করতেন। তাঁর এক পূর্বপুরুষ সৈয়দ শাহাদাত আলী ইসলাম প্রচারের উদ্দেশ্যে আরব থেকে বাংলায় আগমন করেন।
গ্রামের মক্তবে প্রাথমিক শিক্ষা সম্পন্ন করার পর তিতুমীর স্থানীয় এক মাদ্রাসায় অধ্যয়ন করেন। তিনি কুরআনের হাফেজ ছিলেন এবং বাংলা, আরবি ও ফার্সি ভাষায় দক্ষতা অর্জন করেন। পাশাপাশি আরবি ও ফার্সি সাহিত্যের প্রতি গভীর অনুরাগ ছিল তাঁর। ইসলামি ধর্মশাস্ত্র, আইনশাস্ত্র, দর্শন, তাসাওয়াফ ও মানতিক বিষয়েও তিনি সুপণ্ডিত ছিলেন। মাদ্রাসায় অধ্যয়নকালে একজন দক্ষ কুস্তিগীর হিসেবে তিনি পরিচিতি লাভ করেন।
পবিত্র হজ পালনকালে মক্কায় অবস্থানরত সময়ে তিতুমীর বিপ্লবী নেতা ও মুক্তিসংগ্রামের পথপ্রদর্শক সাইয়িদ আহমদ বেরেলভীর সান্নিধ্যে আসেন। তাঁর অনুপ্রেরণায় বাংলার মুসলমান সমাজকে অনৈসলামিক রীতিনীতি ও বিদেশি শাসনের পরাধীনতা থেকে মুক্ত করার সংকল্প গ্রহণ করেন তিতুমীর।
১৮২৭ সালে দেশে ফিরে তিনি সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কারে আত্মনিয়োগ করেন। বাংলাদেশের ইতিহাসবিদ অধ্যাপক আবদুল মমিন চৌধুরীর মতে, ” তিতুমীর প্রথমে একজন সমাজ ও ধর্মীয় সংস্কারক হিসেবেই তার কার্যক্রম শুরু করেন। পরবর্তীতে এই আন্দোলনই অর্থনৈতিক শোষণ ও ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রামে রূপ নেয়। “
তিতুমীর ‘তরিকাহ-ই-মুহাম্মদিয়া’ নামে একটি ধর্মীয় আন্দোলন প্রতিষ্ঠা করেন এবং মুসলমানদের মধ্যে ইসলামি অনুশাসন পালনে উৎসাহিত করেন। তিনি ধুতি পরিহারের পরিবর্তে ‘তাহ্বান্দ’ নামক পোশাক প্রচলন করেন।
হিন্দু জমিদার কৃষ্ণদেব রায় কর্তৃক মুসলমানদের ওপর আরোপিত দাঁড়ি রাখার খাজনা ও মসজিদের ওপর আরোপিত করের তীব্র প্রতিবাদ করেন তিতুমীর। এতে স্থানীয় জমিদার ও নীলকর সাহেবদের সঙ্গে তাঁর সংঘর্ষ ক্রমশ তীব্র হয়ে ওঠে। কৃষকদের ওপর অত্যাচারের বিরোধিতা করতে গিয়ে তিনি পার্শ্ববর্তী এলাকার আরও কয়েকজন জমিদারের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়িয়ে পড়েন।
১৮৩১ সালের ২৩ অক্টোবর বারাসতের কাছে নারিকেলবাড়িয়ায় তিতুমীর তার অনুসারীদের নিয়ে বাঁশের কেল্লা নির্মাণ করেন। কৃষকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে গিয়ে তিনি একটি মুজাহিদ বাহিনী গঠন করেন এবং দেশীয় অস্ত্র ব্যবহারে তাদের প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর ভাগ্নে গোলাম মাসুম কে বাহিনীর অধিনায়ক নিযুক্ত করেন।
তিতুমীরের ক্রমবর্ধমান শক্তিতে শঙ্কিত হয়ে স্থানীয় জমিদাররা ব্রিটিশদের সহায়তা কামনা করে। একাধিক সংঘর্ষে ব্রিটিশ ও জমিদার বাহিনী পরাজিত হয়ে শেষ পর্যন্ত গভর্নর জেনারেল লর্ড উইলিয়াম বেন্টিঙ্ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল স্টুয়ার্টের নেতৃত্বে ১০০ অশ্বারোহী, ৩০০ স্থানীয় পদাতিক, দুটি কামানসহ গোলন্দাজ সৈন্যের একটি সুসজ্জিত বাহিনী তিতুমীরের বিরুদ্ধে প্রেরণ করেন।
১৮৩১ সালের ১৪ নভেম্বর কামান ও আধুনিক অস্ত্রের সাহায্যে ব্রিটিশ বাহিনী বাঁশের কেল্লায় আক্রমণ চালায়। কয়েকদিনের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর ১৯ নভেম্বর নারিকেলবাড়িয়ায় তিতুমীর তাঁর অসংখ্য অনুসারীসহ শহীদ হন। অধিনায়ক গোলাম মাসুম প্রায় ৩৫০ জন বিপ্লবী সৈনিকসহ গ্রেপ্তার হন। পরবর্তীতে গোলাম মাসুমকে মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হয় এবং বাকিদের কারাদণ্ড প্রদান করা হয়।
ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলনের এই বীর সেনানীর আত্মত্যাগ বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে মুক্তিযোদ্ধাদের অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করেছে। তিতুমীরের স্মরণে বাংলাদেশে বিভিন্ন স্থাপনা ও প্রতিষ্ঠানের নামকরণ করা হয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো — রাজধানীর সরকারি তিতুমীর কলেজ, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘তিতুমীর হল’ , বাংলাদেশ নৌবাহিনীর ঘাঁটি ’বানৌজা তিতুমীর’ , যুদ্ধজাহাজ ’বিএনএস তিতুমীর’ এবং রাজশাহী থেকে চিলাহাটি রুটে চলাচলকারী আন্তঃনগর ট্রেন ’তিতুমীর এক্সপ্রেস’।
শহীদ তিতুমীরের জীবন ও সংগ্রাম আজও অন্যায় ও শোষণের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের প্রতীক হিসেবে ইতিহাসে অম্লান হয়ে আছে।
ওএফ



