ঢাকার মুকুট কার মাথায়? চার কান্ডারির মর্যাদার যুদ্ধ

রাজনীতিতে একটা অলিখিত নিয়ম ছিল—শীর্ষ নেতারা সাধারণত নিজের এলাকায় ‘নিরাপদ’ আসনে নির্বাচন করেন। ঢাকা বরাবরই অনিশ্চয়তার কেন্দ্র হওয়ায় এখানে দলীয় প্রধানদের প্রার্থিতা ছিল বিরল, আর লড়লেও পরাজয়ের ঝুঁকি থাকতো অনেক। তবে ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সেই প্রথা ভেঙে ঢাকার ৪টি আসনে সরাসরি লড়াইয়ে নেমেছেন ৪টি বড় দলের শীর্ষ নেতা।
হেভিওয়েট লড়াইয়ের মানচিত্র: ঢাকা-১৭: বিএনপির চেয়ারম্যান তারেক রহমান (গুলশান-বনানী), ঢাকা-১৫: জামায়াতে ইসলামীর আমির ডা. শফিকুর রহমান (কাফরুল),ঢাকা-১১: এনসিপি-এর আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম (রামপুরা-বাড্ডা),ঢাকা-১৩: খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক (মোহাম্মদপুর-আদাবর)
এবারের লড়াই কেবল সংসদ সদস্য হওয়ার নয়, বরং দলীয় ‘ইমেজ’ রক্ষার। এই চার আসনের ফলাফল জাতীয় রাজনীতিতে দলগুলোর শক্তির জানান দেবে। জয় পেলে রাজনৈতিক অবস্থান যেমন সুসংহত হবে, তেমনি পরাজয় ডেকে আনতে পারে বড় ধরনের ইমেজ সংকট। এই ‘প্রেস্টিজ ইস্যু’র কারণেই সাধারণ ভোটারদের পাশাপাশি দেশজুড়ে রাজনৈতিক মহলে তৈরি হয়েছে বাড়তি কৌতূহল ও উত্তেজনা।
ঢাকা-১৭: তারেক রহমানের নতুন চ্যালেঞ্জ
ঢাকা-১৭ আসনে তারেক রহমানের প্রার্থিতা চূড়ান্ত হওয়ার পর থেকেই বিএনপি শিবিরে ব্যাপক উৎসাহ দেখা যাচ্ছে। গত ২৭ ডিসেম্বর প্রার্থিতা নিশ্চিত হওয়ার পর থেকে তিনি তৃণমূলের নেতাকর্মীদের সঙ্গে নিরলসভাবে কাজ করছেন। উল্লেখ্য যে, এই আসনে আগে ২০ দলীয় জোটের শরিক বিজেপির চেয়ারম্যান ব্যারিস্টার আন্দালিব রহমান পার্থ গণসংযোগ করছিলেন। তবে তারেক রহমানের আগমনে তিনি নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ভোলা-১ আসনে নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নেন। এই আসনে তারেক রহমানের মূল লড়াই হতে যাচ্ছে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী ডা. খালিদুজ্জামানের সাথে।
ঢাকা-১৫: শফিকুর রহমানের শক্ত অবস্থান
দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা-১৫ আসনে নিজের অবস্থান তৈরি করেছেন জামায়াত আমির ডা. শফিকুর রহমান। ২০১৮ সালের নির্বাচনে তিনি জোটের হয়ে লড়াই করে কামাল আহমেদ মজুমদারের কাছে হেরেছিলেন। তবে এবার তিনি স্বতন্ত্রভাবে দলীয় প্রতীক ‘দাঁড়িপাল্লা’ নিয়ে মাঠে নেমেছেন। এই আসনে তার প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে লড়ছেন বিএনপির কেন্দ্রীয় প্রভাবশালী নেতা শফিকুল ইসলাম মিল্টন।
ঢাকা-১১: জোটের সমীকরণে নাহিদ ইসলাম
ঢাকা-১১ আসনের চিত্র অনেকটা বদলে গেছে এনসিপি ও জামায়াতের নতুন মেরুকরণে। এনসিপি প্রধান নাহিদ ইসলামের প্রচারণা শুরুতে ঝিমিয়ে থাকলেও ২৮ জুন তার দল জামায়াত জোটে যোগ দেওয়ার পর দৃশ্যপট পাল্টে যায়। জামায়াতের প্রার্থী আতিকুর রহমান নিজের প্রার্থিতা প্রত্যাহার করে নাহিদ ইসলামকে সমর্থন দেওয়ায় তিনি এখন জামায়াতের বিশাল কর্মী বাহিনী নিয়ে নির্বাচনী মাঠে দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। এখানে তার মূল প্রতিদ্বন্দ্বী বিএনপির ড. এম এ কাইয়ুম।
ঢাকা-১৩: মামুনুল হক বনাম ববি হাজ্জাজ
ঢাকা-১৩ আসনে ১০ দলীয় জোটের মনোনীত প্রার্থী মাওলানা মামুনুল হকের জন্য পথ অনেকটাই মসৃণ করেছে জামায়াত ও ইসলামী আন্দোলন; তারা মামুনুল হকের সম্মানে এই আসন থেকে প্রার্থী সরিয়ে নিয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির হয়ে চমক দেখিয়েছেন এনডিএম চেয়ারম্যান ববি হাজ্জাজ। নির্বাচনী বিধিমালা মেনে তিনি নিজের দল থেকে পদত্যাগ করে ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে লড়াইয়ে নেমেছেন, যা এই আসনের নির্বাচনকে বেশ জমজমাট করে তুলেছে।
ঢাকার আসনে দলীয় প্রধানদের জয়-পরাজয়ের ইতিহাস রয়েছে। ১৯৯১ সালের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনা ঢাকা-৭ ও ঢাকা-১০—দুটি আসনেই পরাজিত হন। আবার ২০০৮ সালের নির্বাচনে ঢাকা-১৭ আসনে মহাজোটের প্রার্থী হিসেবে জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদ বিপুল ভোটে জয়ী হন।
২০১৮ সালে ঢাকা-১৫ আসনে জামায়াতের ডা. শফিকুর রহমানও পরাজয়ের মুখ দেখেন। এসব উদাহরণই ঢাকার আসনকে দলীয় প্রধানদের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচিত হওয়ার পেছনে বড় কারণ।
বিশ্লেষকদের দৃষ্টিতে, এবারের নির্বাচনে ঢাকায় সবচেয়ে বেশি সংখ্যক দলীয় প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন।
বিশ্লেষকদের মতে, ঢাকার আসনে পরাজয় দলীয় প্রধানদের জন্য ইমেজ সংকট তৈরি করতে পারে বলেই সাধারণত তারা নিরাপদ আসন বেছে নেন। অতীতে ভোটারদের আঞ্চলিক সমীকরণ ও রাজনৈতিক গণজোয়ার অনেক সময় ফলাফল নির্ধারণ করেছে। এবারের নির্বাচনেও সে ধরনের কোনো সমীকরণ তৈরি হয় কিনা, সেটিই এখন দেখার বিষয়।



