‘প্রতিরোধ একটি কুরআনভিত্তিক, নৈতিক ও সভ্যতাগত আদর্শ’

প্রতিরোধ কেবল সামরিক বা রাজনৈতিক কোনো অবস্থান নয়; বরং এটি একটি কুরআনিক, নৈতিক ও সভ্যতাগত চেতনা বলে মন্তব্য করেছেন ইরানের হাওজা ইসলামিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হুজ্জাতুল ইসলাম সাইয়্যেদ মুস্তাফা মুসাভি।
মুবাহালা দিবস, সূরা ‘হাল আতা’ (সূরা আল – ইনসান) অবতীর্ণ হওয়ার স্মরণ এবং পবিত্র জিলহজ মাস উপলক্ষে আয়োজিত এক আন্তর্জাতিক ওয়েবিনারে তিনি এ মন্তব্য করেন।
সাইয়্যেদ মুসাভি বলেন, সত্য বিকৃতি, রাজনৈতিক আধিপত্য, দখলদারিত্ব, অবরোধ, জাতিগোষ্ঠীর অবমাননা এবং মজলুমদের প্রতি উদাসীনতার বিরুদ্ধে একটি উম্মাহর দৃঢ় অবস্থানই প্রকৃত প্রতিরোধ। তিনি বলেন, কুরআন মানুষকে হক ও বাতিল, ন্যায় ও অন্যায়, আত্মত্যাগ, মানবিক মর্যাদা এবং মজলুমের পক্ষে দাঁড়ানোর সর্বজনীন দর্শন প্রদান করে।
তিনি সূরা আলে ইমরানের ৬১ নম্বর আয়াতে বর্ণিত মুবাহালার প্রসঙ্গ তুলে ধরে বলেন, মুবাহালা শুধু একটি ঐতিহাসিক ঘটনা নয়; বরং সত্য বিকৃতির বিরুদ্ধে অবিচল থাকার এক কুরআনিক আদর্শ। আয়াতে ব্যবহৃত ‘মিন বা’দি মা জা’আকা মিনাল ইলম’ বাক্যাংশের উল্লেখ করে তিনি বলেন, মুবাহালা জ্ঞান, সংলাপ ও যুক্তির মাধ্যমে সত্য প্রতিষ্ঠার পরবর্তী ধাপ। তাই প্রতিরোধও শুরু হতে হবে সচেতনতা, জ্ঞান ও সঠিক ব্যাখ্যা থেকে।
তার মতে, সামরিক প্রতিরোধের আগে প্রয়োজন বুদ্ধিবৃত্তিক প্রতিরোধ এবং রাজনৈতিক অবস্থান গ্রহণের আগে প্রয়োজন সত্যকে জানা। আধুনিক বিশ্বে গণমাধ্যম ও বর্ণনার ক্ষেত্রে সত্য বিকৃতির বিরুদ্ধে লড়াইকে তিনি আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সংগ্রাম হিসেবে উল্লেখ করেন।
মুবাহালার ঘটনায় আহলুল বাইতের (আ.) উপস্থিতির তাৎপর্য তুলে ধরে তিনি বলেন, মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) এ ঐতিহাসিক মুহূর্তে ইমাম আলী (আ.), হজরত ফাতিমা (সা.), ইমাম হাসান (আ.) ও ইমাম হুসাইনকে (আ.) সঙ্গে নিয়েছিলেন, যা তাদের সত্যের মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে।
ওয়েবিনারে তিনি আরও বলেন, আধিপত্যবাদী শক্তিগুলো দখলদারিত্বকে ‘নিরাপত্তা রক্ষা’ এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর প্রতিরোধকে ‘হুমকি’ হিসেবে উপস্থাপনের চেষ্টা করছে। এমন পরিস্থিতিতে সত্যকে বিশ্বজনীন, নৈতিক ও বৈজ্ঞানিক ভাষায় তুলে ধরার সক্ষমতা অর্জনের ওপর তিনি গুরুত্বারোপ করেন।
সূরা আল – ইনসানের আলোচনায় তিনি বলেন, মিসকিন, এতিম ও বন্দিকে খাদ্যদানের মাধ্যমে আহলুল বাইত (আ.) সামাজিক আত্মত্যাগ ও মানবিক দায়িত্ববোধের অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। প্রতিরোধের প্রকৃত মূল্য তখনই প্রকাশ পায়, যখন কঠিন পরিস্থিতিতেও সমাজ মজলুম ও বঞ্চিত মানুষের পাশে দাঁড়ায়।
তিনি বলেন, আহলুল বাইতের (আ.) প্রতিরোধ-দর্শনের দুটি দিক রয়েছে — মজলুমদের রক্ষা এবং বহিরাগত আধিপত্যের মোকাবিলা, পাশাপাশি সামাজিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা, দরিদ্র ও বঞ্চিত মানুষের সেবা এবং সমাজের কষ্ট লাঘবে ভূমিকা রাখা।
বক্তব্যের শেষাংশে সাইয়্যেদ মুসাভি বলেন, প্রতিরোধের নৈতিকতা হলো মানবিক মর্যাদা রক্ষা। পবিত্র কুরআন এমনকি বন্দিকেও মানবিক মর্যাদার পরিসর থেকে বাদ দেয়নি। তাই ধর্মীয় প্রতিরোধ কখনো অন্ধ সহিংসতা বা প্রতিশোধের নাম নয়; বরং এটি ন্যায়, মানবিকতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত একটি নৈতিক সংগ্রাম।
ওএফ



