মাতৃত্বের আয়নায় শিক্ষিকারা: ভালোবাসা ও আত্মত্যাগের গল্প

মা—ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে গভীর ভালোবাসা, ত্যাগ আর নিরাপত্তার অনুভূতি। মা দিবস উপলক্ষে সরকারি তিতুমীর কলেজের বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষিকারা তুলে ধরেছেন মাতৃত্বের আবেগ, দায়িত্ব, সংগ্রাম আর সন্তানের প্রতি নিঃস্বার্থ ভালোবাসার কথা। কেউ বলেছেন মায়ের মমতার কথা, কেউ তুলে ধরেছেন মাতৃত্বের ত্যাগ, আবার কেউ স্মরণ করেছেন নিজের মায়ের অনুপ্রেরণা। শিক্ষিকাদের চোখে মা শুধু একজন অভিভাবক নন, তিনি সন্তানের প্রথম শিক্ষক, সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় এবং জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস।
সন্তানের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয় মা
কানিজ ফাতেমা
সহযোগী অধ্যাপক, অর্থনীতি বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ
মা দিবস আমার কাছে শুধু একটি আনুষ্ঠানিক দিন নয়, এটি মা ও মাতৃত্বের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা এবং কৃতজ্ঞতা প্রকাশের এক বিশেষ উপলক্ষ। জন্মের পর পৃথিবীতে আমরা প্রথম যে শব্দটি উচ্চারণ করি, তা হলো “মা”। এই ছোট্ট শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে পৃথিবীর সবচেয়ে বিশুদ্ধ ভালোবাসা, নিরাপত্তা আর মমতা। আমার কাছে মা মানেই সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়স্থল। একজন মা নিজের সুখ, স্বপ্ন কিংবা ক্লান্তির কথা না ভেবে সারাজীবন সন্তানের জন্য নিজেকে উৎসর্গ করেন। সন্তানের মুখে হাসি ফোটাতে পারলেই যেন তার জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ পূর্ণ হয়। সন্তান যখন বলে, “মা, আমি এটা খাবো”, তখন একজন মায়ের কাছে সেটিই উৎসবের মতো অনুভূতি তৈরি করে। আমি মনে করি, মাকে ভালোবাসার জন্য আলাদা কোনো দিনের প্রয়োজন হয় না। প্রতিটি দিনই হওয়া উচিত মায়ের জন্য ভালোবাসা আর সম্মান প্রকাশের দিন। তারপরও মা দিবস আমাদের সেই সুযোগটি নতুনভাবে মনে করিয়ে দেয়।
মাতৃত্বের ইতিহাস আর সন্তানের দায়বদ্ধতা
প্রফেসর ড.জোহরা সুলতানা রুনী
চেয়ারম্যান, ইতিহাস বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ
ইতিহাসের পাতায় নজর দিলে বারবার একটি বিষয়ই স্পষ্ট হয়ে ওঠে—একজন মা তার সন্তানের জন্য সবকিছু ত্যাগ করতে পারেন। কারণ তিনি তো মা। মা হওয়া কোনো হঠাৎ ঘটে যাওয়া বিষয় নয়; এর পেছনে থাকে দীর্ঘ প্রতীক্ষা, অনুভূতি আর অসীম মমতা। নয় মাস দশ দিন ধরে একজন নারীর ভেতরে তিল তিল করে গড়ে ওঠে মাতৃত্বের সেই গভীর আকুতি। তাই সন্তানের জন্য একজন মায়ের ত্যাগকে কোনো সংখ্যা বা হিসাব দিয়ে বিচার করা সম্ভব নয়।
একসময় হয়তো মা দিবস ছিল না, তখন আলাদা করে বলা হতো না—“মা, তোমাকে অনেক ভালোবাসি।” কিন্তু এখন একটি নির্দিষ্ট দিন আছে বলেই সন্তানরা বিশেষভাবে মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের সুযোগ পাচ্ছে। আমি মনে করি, মায়ের বৃদ্ধ বয়সে তার সেবা ও যত্ন নেওয়া সন্তানের অন্যতম বড় দায়িত্ব। মায়ের ছোট ছোট প্রয়োজন, অনুভূতি কিংবা কষ্টের দিকেও সন্তানের খেয়াল রাখা উচিত।
কিন্তু বর্তমান সময়ে অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায়, সন্তানরা ব্যস্ততা বা নানা প্রতিকূলতার কারণে সেই দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। কখনও এটি ইচ্ছাকৃত, আবার কখনও অনিচ্ছাকৃতও হয়ে থাকে। তবুও একজন সন্তানের উচিত সবসময় মাকে নিরাপত্তা দেওয়া, তার পাশে থাকা এবং বৃদ্ধ বয়সে তাকে যত্নে আগলে রাখা। কারণ একজন মা সারাজীবন যেভাবে সন্তানকে আগলে রাখেন, সন্তানেরও দায়িত্ব ভালোবাসা ও সম্মানের মাধ্যমে সেই ঋণ কিছুটা হলেও পরিশোধ করার চেষ্টা করা।
মাতৃত্বের নিঃস্বার্থ ভালোবাসা ও মা দিবসের অনুভব
সেলিনা আক্তার
অধ্যাপক, উদ্ভিদবিজ্ঞান বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ
মায়ের প্রতি ভালোবাসা একদিনে কিংবা কয়েকটি কথায় প্রকাশ করার মতো কোনো বিষয় নয়। কারণ একজন মায়ের মমতা, ত্যাগ আর ভালোবাসা সন্তানের পুরো জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয় ও পাথেয়। তবুও বর্তমানের এই যান্ত্রিক জীবনে মা দিবস পালনের একটি বিশেষ ইতিবাচক দিক রয়েছে বলে আমি মনে করি। হাজারো ব্যস্ততার মাঝেও অন্তত এই একটি দিনে আমরা মায়ের কথা ভাবি। এই দিনটি না থাকলে হয়তো জীবনের ব্যস্ততায় আমরা এই সামান্য কৃতজ্ঞতাটুকুও প্রকাশ করতে ভুলে যেতাম।
আমার বিশ্বাস, মায়ের অনুভূতি একজন সন্তান পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে তখনই, যখন সে নিজে মা কিংবা বাবা হয়। সন্তান পৃথিবীতে আসার পর থেকেই একজন মায়ের ত্যাগের শুরু। মায়েরা নিজের জন্য নয়, সন্তানের ভালোর জন্যই বেঁচে থাকেন।
তবে জীবনের এক অদ্ভুত বাস্তবতা হলো, সন্তান যখন বড় হতে থাকে বা কৈশোরে পা দেয়, তখন অনেকেই মায়ের এই নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রকৃত মূল্য বুঝতে পারে না। বয়সের একটি পর্যায়ে সন্তানরা কখনও কখনও মায়ের আবেগকে তুচ্ছজ্ঞান করে কিংবা দূরে সরে যায়। কিন্তু সময়ের সঙ্গে যখন জীবনের পরিপক্কতা আসে, তখনই তারা উপলব্ধি করে—একজন মা সন্তানের জন্য কত কিছু বিসর্জন দিয়েছেন।
মা দিবস উপলক্ষে সেলিনা আক্তার একটি কবিতা লিখেছেন
মা যে আমার মা
—– সেলিনা আক্তার
মা যে আমার মা,
তোমার মতো এত আপন
কেউতো হবে না….।
নয়টা মাস গর্ভে ধরে,
প্রসব ব্যথা সহ্য করে,
আমায় পেয়ে আনন্দেতে,
ভুলে গেলে সকল যন্ত্রণা।
মা যে আমার “সর্বংসহা মা”…..।
শিশুকালে যত্ন করে,
কত আদর মায়ায় ভরে,
আগলে রেখে এই আমারে,
চোখের আড়াল হতে দিলে না,
মা যে আমার “মমতাময়ী মা”….।
নিজের খাবার খাইয়ে মোরে
তুমি রইলে অনাহারে,
তোমার মতো কেউতো পারে না,
মা যে আমার “ধৈর্যশীলা মা”….।
কখনও অসুস্থ হলে,
দুচোখ ভিজাও অশ্রুজলে,
রাত্রি জেগে সেবা করো,
সবাই ঘুমায় তুমি ঘুমাও না।
মা যে আমার “দরদীনি মা”….।
নিজের সুখটা ভুলে গিয়ে,
বাঁচলে কেবল আমায় নিয়ে,
আমায় ছাড়া কিচ্ছু ভাবলে না,
মা যে আমার “স্বার্থহীনা মা”….
এত বড় জগতমাঝে,
কত মানুষ চারিপাশে,
তোমার মতো এত ভালো কেউতো বাসে না,
মা যে আমার “তুলনাহীনা মা”….।
মাতৃত্ব আমাকে প্রতিদিন নতুন করে শক্তি দেয়
রোকসানা আক্তার
সহযোগী অধ্যাপক, গণিত বিভাগ, সরকারি তিতুমীর কলেজ
“মা”—ছোট্ট একটি শব্দ, অথচ এর ভেতরেই লুকিয়ে আছে পুরো পৃথিবীর ভালোবাসা, আশ্রয় আর শান্তি। আমার কাছে মা শুধু একটি সম্পর্ক নয়; এটি একটি গভীর অনুভূতি, এক বিশাল দায়িত্ব এবং প্রতিদিন নিজেকে নতুন করে আবিষ্কার করার এক অসাধারণ যাত্রা। জীবনের বহু পরিচয়ের ভিড়ে “মা” পরিচয়টিই আমাকে সবচেয়ে বেশি শক্তি জুগিয়েছে।
মাতৃত্বের পথ কখনোই সহজ নয়। একজন মা হিসেবে আমি ধৈর্য, সহনশীলতা এবং নিঃস্বার্থ ভালোবাসার প্রকৃত অর্থ শিখেছি। সন্তানের মুখের একটি হাসি আমাকে নতুন করে বাঁচার শক্তি দিয়েছে। জীবনের প্রতিটি বাধা অতিক্রম করতে গিয়ে আমি উপলব্ধি করেছি—একজন মা নিজের ভেতরে এমন এক শক্তি ধারণ করেন, যার গভীরতা হয়তো তিনি নিজেও পুরোপুরি জানেন না।
আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অনুপ্রেরণা আমার নিজের মা। তাঁর অগাধ ভালোবাসা, ত্যাগ আর সমর্থন আমাকে প্রতিনিয়ত সাহস জুগিয়েছে। আজ আমি একজন মা হিসেবে যা কিছু শিখেছি, তার বড় একটি অংশই তাঁর কাছ থেকে পাওয়া। আমার কাছে একজন মা শুধু একজন মানুষ নন—তিনি এক অদম্য শক্তির নাম।
ওএফ



