মা হারানো শিক্ষার্থীদের চোখে মা দিবস: শূন্যতা, স্মৃতি আর অশ্রুভেজা ভালোবাসা

মা দিবস আসলে পৃথিবীর সব মায়ের প্রতি ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশের দিন হলেও, কিছু শিক্ষার্থীর জন্য এই দিনটি হয়ে ওঠে গভীর শূন্যতা আর নীরব কষ্টের প্রতিচ্ছবি। সরকারি তিতুমীর কলেজের মা হারানো শিক্ষার্থীরা জানান, মায়ের স্মৃতি তাদের জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে জড়িয়ে আছে—হাসিতে, কান্নায়, সংগ্রামে আর নীরব একাকিত্বে। কেউ বলেন মায়ের অভাব প্রতিদিন অনুভব করেন, কেউ আবার মায়ের স্নেহের স্মৃতি আঁকড়ে ধরে বেঁচে আছেন। মা দিবস তাদের কাছে শুধু উৎসব নয়, এটি ভালোবাসার অপূর্ণতা আর চিরন্তন অপেক্ষার এক আবেগঘন নাম।
ক্লাস নাইনে পড়া অবস্থায় মা কে হারানো দর্শন বিভাগের শিক্ষার্থী সামিয়া কবির স্বর্ণা মায়ের স্মৃতিচারণ করে বলেন, আমার কাছে “মা”না থাকা মানে শুধু একজন মানুষকে হারানো নয়—এটি জীবনের সবচেয়ে বড় আশ্রয়, ভালোবাসা আর নিরাপত্তা হারানো। আমি গভীরভাবে অনুভব করি, মা না থাকলে জীবনে যে শূন্যতা তৈরি হয় তা কখনো পূরণ হয় না। মায়ের মতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর কেউ দিতে পারে না। “কেমন আছো?”,“খেয়েছো কিনা?”— এই ছোট ছোট যত্নগুলোই জীবনের সবচেয়ে বড় শক্তি, যা এখন আমি প্রতিদিন মিস করি। জীবনের কঠিন সময়গুলোতে মায়ের পরামর্শ, সাহস আর উপস্থিতি একজন সন্তানের জন্য সবচেয়ে বড় ভরসা। আমি যখন সমস্যার মুখোমুখি হই, তখন মায়ের সেই সাহসী কথাগুলো আর পাই না। অসুস্থ হলে মায়ের মতো করে কেউ আর যত্ন নিতে পারে না। ঈদ, জন্মদিন বা কোনো আনন্দের মুহূর্তেও মা থাকলে আলাদা এক উষ্ণতা থাকে। মা ছাড়া সেই আনন্দ অনেকটাই ফিকে হয়ে যায়। আল্লাহ যেন আমার মাকে জান্নাতুল ফেরদৌসের সর্বোচ্চ মাকাম দান করেন, আমিন।
জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে মায়ের অভাব বোধ করেন মার্কেটিং বিভাগের শিক্ষার্থী একেএম আনিসুর রহমান চৌধুরী, মা একটি শব্দ নয়—মা মানে জীবনের সব সমস্যার সহজ সমাধান, সব কষ্টের অবসান, আর নিঃশর্ত ভালোবাসার এক চিরন্তন আশ্রয়। মা মানে আমার সকল আবদার পূরণ হওয়ার জাদুর বাক্স, দিনের শেষে গল্প করার সবচেয়ে নিরাপদ সঙ্গী, আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের নীরব সাক্ষী সেই “সাত রাজার ধন”।
মায়ের প্রতি অব্যক্ত কথাগুলো কখনো শেষ হয় না। মনে হয়, মাকে অনেক কিছু বলার ছিল। তোমাকে অনেক ভালোবাসি মা। তুমি ছাড়া জীবন কতটা শূন্য। তোমার মতো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা আর কেউ দিতে পারে না। মা ছাড়া জীবন যেন প্রতিটি পদে শূন্যতার নাম। প্রথমবার আঙুল কেটে গেলে “মা মা” বলে কান্না, অসুস্থতায় মায়ের হাত খোঁজা, মায়ের রান্নার স্বাদ মিস করা, কিংবা মা দিবসে মাকে জড়িয়ে ধরার অপূর্ণতা—সবকিছুই এক গভীর শূন্যতা তৈরি করে।
অন্যদিকে, যদি মা থাকতেন—তাহলে জীবন হতো মরুভূমিতে পানির ফুয়ারার মতো, বিপদের একমাত্র সমাধান, আর প্রতিটি দিনের সবচেয়ে বড় শান্তি। মায়ের শাসন, বকা আর ভালোবাসার মধ্যেই লুকিয়ে থাকত জীবনের সবচেয়ে নিরাপদ আশ্রয়।
মা থাকলে জীবন হয় সম্পূর্ণ, আর মা না থাকলে সেই শূন্যতা কোনো ভাষায় পূরণ করা যায় না। মা মানেই জীবন, মা মানেই পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সত্য ভালোবাসা।
মায়ের স্মৃতি নিয়ে বেঁচে থাকা ভুগোল ও পরিবেশ বিভাগের শিক্ষার্থী মোসা: পাখি আক্তার বলেন, মাকে নিয়ে লিখতে গেলে মনে হয়, একটি জীবনও হয়তো কম পড়ে যাবে তাঁর ঋণ শোধ করতে। একজন মা হারানো শিক্ষার্থী হিসেবে এই দিনটিকে দেখি ভিন্ন এক অনুভূতিতে। আমার মা ছিলেন এক সংগ্রামী যোদ্ধা। মৃত্যু নামক কঠিন বাস্তবতার কাছে হেরে গিয়ে তিনি আমাকে একা করে চলে গেছেন। সেই শূন্যতা আজও আমার জীবনের সবচেয়ে বড় ক্ষত। আমার মা ছিলেন আমার অস্তিত্বের ভিত্তি। তাঁর ভালোবাসাই ছিল আমার শক্তি। আমি সবসময় স্বপ্ন দেখতাম, মাকে নিয়ে পৃথিবী ঘুরব, পাহাড় দেখাবো, সমুদ্র দেখাবো, তাঁর সব শখ পূরণ করব। কিন্তু সেই স্বপ্নগুলো আর পূর্ণ হয়নি। আজ আমি যখন চারপাশে বন্ধুদের তাদের মায়ের সাথে হাসি-ঠাট্টা, ঝগড়া-খুনসুটি করতে দেখি, তখন এক ধরনের মিশ্র অনুভূতি কাজ করে। আনন্দও পাই, আবার গভীর এক শূন্যতাও অনুভব করি।যদি আমার কাছে আলাদিনের চেরাগ থাকত, আর তিনটি ইচ্ছা পূরণের সুযোগ দেওয়া হতো। আমি তিনবারই আমার মাকে ফিরিয়ে দেওয়ার কথা বলতাম। আমি প্রতিনিয়ত মাকে মিস করি। মনে মনে ভাবি—আমি যদি আজ তাঁর সাথে থাকতাম, তিনি আমাকে কী বলতেন, কী পরামর্শ দিতেন, কীভাবে আদর করতেন। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে তাঁর উপস্থিতি এখনো অনুভব করি, অথচ তিনি নেই। মা দিবস আমার কাছে তাই শুধু একটি দিন নয়, এটি এক গভীর স্মৃতির নাম, এক অপূর্ণ ভালোবাসার নাম।
ওএফ



