রক্ত কেন ল্যাবরেটরিতে তৈরি করা যায় না?
প্রুমংউ মার্মা, দ্বিতীয় বর্ষ, জামালপুর মেডিকেল কলেজ

মানুষ আজ মঙ্গলে যানবাহন পাঠাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা দিয়ে কবিতা লেখানো থেকে শুরু করে বুদ্ধিভিত্তিক কাজ করাচ্ছে। জিনের ভেতর প্রবেশ করে রোগব্যাধি সারাচ্ছে। অথচ এই একই বিজ্ঞান এখন পর্যন্ত একটি কাজ করতে পারেনি সেটি হলো, মানুষের রক্ত তৈরি বা এর বিকল্প করতে।
প্রতিদিন পৃথিবীর কোনো না কোনো হাসপাতালে একজন রোগী রক্তের অভাবে মৃত্যুর দিকে এগিয়ে যাচ্ছেন। দুর্ঘটনায় আহত, অস্ত্রোপচারের বেডে শুয়ে থাকা, ক্যান্সারের চিকিৎসা নিচ্ছেন- এই মানুষগুলোর চোখেমুখে একটাই প্রশ্নে: রক্ত কোথায় পাব? এই মুহূর্তে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান এই রক্ত কোনো কারখানায় তৈরি হয় না। এটি তৈরি হয় মানুষের শরীরে।
রক্ত আসলে কী?
রক্তকে শুধু ‘লাল কোনো তরল পদার্থ’ ভাবলে ভুল হবে। রক্তে থাকে লোহিত রক্তকণিকা (Red Blood Cells), শ্বেত রক্তকণিকা (White Blood Cells) এবং অণুচক্রিকা (Platelets)। উপাদানগুলো ভাসমান থাকে রক্তরস বা প্লাজমায়। মাত্র দুই থেকে তিন ফোঁটা রক্তে থাকে প্রায় ১০০ কোটি লোহিত রক্তকণিকা। প্রতিটি কণিকা একটি নির্দিষ্ট কাজ করে। এদের প্রতিটির গঠনই ভিন্ন এবং প্রতিটির জীবনচক্র আলাদা।
লোহিত কণিকা ফুসফুস থেকে অক্সিজেন বহন করে সারা শরীরে পৌঁছে দেয়। শ্বেত কণিকা ব্যাকটেরিয়া, ভাইরাস ও বাইরের যেকোনো আক্রমণের বিরুদ্ধে লড়াই করে। অণুচক্রিকা রক্ত জমাট বাঁধার কাজটি করে। কোথাও কেটে গেলে রক্তপাত বন্ধ করে। এই তিনটি উপাদান একসঙ্গে কাজ না করলে মানুষ বাঁচতে পারে না।
লোহিত রক্তকণিকার ভেতরে থাকা হিমোগ্লোবিন প্রোটিনটি হলো বিজ্ঞানের কাছে সবচেয়ে বড় ধাঁধাগুলোর একটি। হিমোগ্লোবিন একটি জটিল আয়রন-বাইন্ডিং প্রোটিন; যা অক্সিজেন ও কার্বন ডাই-অক্সাইডসহ শরীরের বিভিন্ন গ্যাস পরিবহন করে।
সমস্যা হলো, লোহিত রক্তকণিকার বাইরে মুক্তভাবে থাকলে হিমোগ্লোবিন বিষাক্ত হয়ে ওঠে। কণিকার ঝিল্লি বা মেমব্রেনটি তাকে রক্ষা করে। এই ঢাল না থাকলে হিমোগ্লোবিন কিডনি ও হৃদপিণ্ডে মারাত্মক ক্ষতি করতে পারে। অর্থাৎ শুধু হিমোগ্লোবিন তৈরি করলেই হবে না, তাকে ঠিক একটি জীবন্ত কণিকার মতো মুড়িয়ে রাখতে হবে এবং এটিই এখন পর্যন্ত পুরোপুরি সম্ভব হয়নি।
বিজ্ঞানীদের চেষ্টা অব্যাহত
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকেই সামরিক বিজ্ঞানীরা কৃত্রিম রক্ত তৈরির চেষ্টা শুরু করেন। পরে বেসামরিক গবেষকরাও যোগ দেন। এক শতাব্দীরও বেশি সময় ধরে গবেষণা চলছে। কিন্তু এতসব চেষ্টার পরেও ফলাফল কী? এখন পর্যন্ত যা তৈরি হয়েছে তাকে ‘কৃত্রিম রক্ত’ বলা যায় না। এগুলোকে বলা হয় ‘ব্লাড সাবস্টিটিউট’ বা ‘অক্সিজেন থেরাপিউটিক্স’। এগুলো কেবল লোহিত কণিকার অক্সিজেন পরিবহনের কাজটুকু অনুকরণ করতে পারে। মূলত দুটি পথে গবেষণা হচ্ছে। একটি হলো হিমোগ্লোবিন-ভিত্তিক অক্সিজেন বাহক (HBOCs) এবং অন্যটি পারফ্লুরোকার্বন-ভিত্তিক বাহক (PFCs)। কিন্তু পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার কারণে এই পণ্যগুলো আন্তর্জাতিক বাজারে ক্লিনিক্যাল ব্যবহারের অনুমতি পায়নি।
কৃত্রিম বিকল্পের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো- এটি কেবল একটি কাজ করতে পারে, রক্তের সব কাজ নয়। বর্তমানে যেসব কৃত্রিম বিকল্প আছে, তার কোনোটিতেই অণুচক্রিকা নেই। ফলে রক্তপাত বন্ধ হয় না। নেই শ্বেত রক্তকণিকা। ফলে শরীরের রোগপ্রতিরোধ ব্যবস্থাও কাজ করে না। একটি পূর্ণ রক্তের বিকল্প হতে হলে এইসব কাজ একসঙ্গে করতে হবে এবং এটাই বিজ্ঞানের কাছে এখনো অসাধ্য।
কৃত্রিম লোহিত কণিকা তৈরির ক্ষেত্রে আরেকটি বড় বাধা হলো- আকৃতি ও নমনীয়তা। মানুষের রক্তনালির সবচেয়ে সরু কৈশিক নালি মাত্র ৫ মাইক্রোমিটার চওড়া। কৃত্রিম কণিকাকে সেই সরু নালির মধ্যদিয়েও বিনা বাধায় প্রবাহিত হতে হবে। এই শর্ত পূরণ করা এখনো বিশাল স্কেলিং বা বৃহৎ উৎপাদনের সমস্যাটিও প্রকট। স্টেম সেল থেকে কৃত্রিম রক্ত তৈরি করা যতটুকু সম্ভব, লক্ষ লক্ষ ইউনিট উৎপাদন করার মতো পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া সেই প্রযুক্তি এখনো সম্ভব হয়নি।
মানুষের রক্তেই একমাত্র পথ
মানবসভ্যতার সবচেয়ে উন্নত ল্যাবরেটরিগুলো যা পারেনি, স্রষ্টা সেটি অনায়াসে সৃষ্টি করে দিয়েছেন প্রতিটি সুস্থ মানুষের শরীরে। প্রতি সেকেন্ডে প্রায় ২৪ লাখ নতুন লোহিত কণিকা তৈরি হচ্ছে অস্থিমজ্জায়। এই জীবন্ত কারখানার নকল করার ক্ষমতা এখনো বিজ্ঞানের নেই। তাই যে সত্যটি আজ সবচেয়ে জরুরি তা হলো- মানুষের রক্তের একমাত্র বিকল্প মানুষই। এটি কোনো আবেগের কথা নয়, এটি বিজ্ঞানের স্বীকারোক্তি অর্থাৎ বাস্তবিক। প্রতিটি স্বেচ্ছা রক্তদানের পেছনে তাই শুধু একটি মানবিক কর্তব্য নেই। আছে একটি বৈজ্ঞানিক অনিবার্যতা। যতদিন ল্যাবরেটরিতে রক্ত তৈরি না হচ্ছে, ততদিন এই দায়িত্ব আমাদেরই। স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের প্রতি অশেষ কৃতজ্ঞতা। ১৪ জুনের শুভেচ্ছা সবাইকে।
বাংলা টিভি/ ব



