অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে ব্যর্থ প্রশাসন, ‘বৃষ্টি না হলে বন্ধ করা কঠিন’—ইউএনও

দৌলতপুর (কুষ্টিয়া) প্রতিনিধি: কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলায় সরকারি ও ব্যক্তিমালিকানাধীন জমির একাধিক স্থান থেকে নিয়মবহির্ভূতভাবে মাটি কেটে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে একটি প্রভাবশালী স্বার্থান্বেষী চক্রের বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, দীর্ঘদিন ধরে উপজেলার বিভিন্ন এলাকা থেকে মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করে আসছে চক্রটি।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, চক্রের সদস্যরা মূলত রাতের আঁধারে মাটি কাটার কাজ পরিচালনা করে। প্রতিদিন রাত ৯টার পর শুরু হওয়া এ কার্যক্রম চলে ভোর ৬টা পর্যন্ত। বিশেষ করে সাপ্তাহিক ছুটির দিনগুলোতে মাটি কাটার মহাউৎসব লেগে যায়। বৃহস্পতিবার রাত থেকে শনিবার রাত পর্যন্ত মাটি কাটার তৎপরতা সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। মাটি কাটার কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে স্কেভেটর (খননযন্ত্র) ও শ্যালো ইঞ্জিনচালিত ট্রলি। এসব যানবাহনের মাধ্যমে দ্রুতগতিতে বিভিন্ন স্থান থেকে মাটি সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
সরেজমিনে উপজেলার ফিলিপনগর ইউনিয়নের বাহেরমাদী সিরাজ নগর টোলপাড়া এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, পানি উন্নয়ন বোর্ডের একটি ক্যানাল গভির গর্ত করে মাটি কাটা হচ্ছে বিক্রির উদ্দেেশ। যেখানে বর্ষা মৌসুমে পদ্মা নদীর পানি প্রবেশ করে, সেখানে রাতের আঁধারে স্কেভেটর দিয়ে ব্যাপকভাবে মাটি কাটা হচ্ছে। ক্যানাল সংলগ্ন বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধ ও পাকা সংযোগ সড়কের একেবারে গা ঘেঁষে চলা এ মাটি কাটার দৃশ্য যে কাউকে উদ্বিগ্ন করে তুলবে। স্থানীয়দের আশঙ্কা, এভাবে মাটি কাটা অব্যাহত থাকলে ভবিষ্যতে বাঁধ ও সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়তে পারে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, একটি সংঘবদ্ধ চক্র দীর্ঘদিন ধরে সরকারি জমি ও ক্যানালের মাটি কেটে বিক্রি করছে। তারা এ কাজে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তির সম্পৃক্ততার অভিযোগ তুলে বানাত ব্যাপারী, আশরাফুল ও কালামের নাম উল্লেখ করেন।
স্থানীয়দের দাবি, প্রতিরাতে অন্তত এক হাজার ট্রলি মাটি বিভিন্ন স্থানে সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন এলাকাবাসী বলেন, প্রশাসনের নজরদারির অভাবে সরকারি সম্পদ লুটপাট করা হচ্ছে। এতে একদিকে সরকারি জমির ক্ষতি হচ্ছে, অন্যদিকে বাঁধ ও ক্যানালের স্থায়িত্বও হুমকির মুখে পড়ছে।
অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে বানাত ব্যাপারী প্রথমে দাবি করেন, তিনি নিজের জমির মাটি কাটছেন। তবে রাতের আঁধারে কেন মাটি কাটা হচ্ছে জানতে চাইলে তিনি বলেন, “আমি না, অন্যরা কাটছে।” জমি তার হলে অন্যরা কীভাবে মাটি কাটছে—এ প্রশ্নের কোনো সদুত্তর দিতে পারেননি তিনি।
ফিলিপনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান একরামুল হক বলেন, “স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র ক্যানালের মাটি কেটে বিক্রি করছে বলে শুনেছি। তারা প্রভাবশালী হওয়ায় অনেকেই মুখ খুলতে ভয় পায়। বিষয়টি প্রশাসনকে জানানো হবে।”
এদিকে সরকারি ক্যানাল ও বাঁধ রক্ষায় দ্রুত অভিযান পরিচালনা করে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্রে জানা গেছে, সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় গত বৃহস্পতিবার দৌলতপুর থানায় একটি লিখিত অভিযোগ দেওয়া হয়েছে। পানি উন্নয়ন বোর্ডের কার্যসহকারী শফিকুল ইসলাম বাদী হয়ে এজাহার জমা দেন। তবে অভিযোগ দায়েরের পরও শনিবার পর্যন্ত দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। তাদের দাবি, অভিযোগের পরও শুক্রবার রাত হতে শনিবার সকাল পর্যন্ত মাটি কাটা অব্যাহত ছিল।
এ বিষয়ে দৌলতপুর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আরিফুর রহমানের বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, “এজাহারটি তদন্তের জন্য প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
অবৈধ মাটি কাটা বন্ধে প্রশাসনের ভূমিকা নিয়ে জানতে চাইলে দৌলতপুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, “আমরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছি। তবে মাটি কাটা চক্রগুলো রাতের বেলায় কাজ করে। অনেক সময় অভিযানে গিয়ে তাদের পাওয়া যায় না। মাটি কাটা বন্ধ করতে হলে বৃষ্টিরও প্রয়োজন রয়েছে।”
তবে স্থানীয়দের প্রশ্ন, দীর্ঘদিন ধরে প্রকাশ্যে চলতে থাকা এসব অবৈধ কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে না পারা কি প্রশাসনের ব্যর্থতা, নাকি এর পেছনে অন্য কোনো কারণ রয়েছে? তারা মনে করেন, বিষয়টি নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করে প্রকৃত চিত্র উদঘাটনে ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরদারি ও তদারকি প্রয়োজন।



