চলমান সং/ঘা/ত/কে কেন ধর্মযু/দ্ধ হিসেবে তুলে ধরছে যুক্তরাষ্ট্র-ই/স/রা/য়ে/ল

মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত আজ বুধবার পঞ্চম দিনে গড়িয়েছে। এই যুদ্ধের প্রেক্ষাপটে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের শীর্ষ কর্মকর্তাদের ধর্মীয় ভাষা ও প্রতীকী বয়ান নতুন বিতর্কের জন্ম দিয়েছে বিশ্বজুড়ে। মার্কিন পর্যবেক্ষক সংস্থা মিলিটারি রিলিজিয়াস ফ্রিডম ফাউন্ডেশন জানিয়েছে, মার্কিন সেনাদের ইমেইলের মাধ্যমে জানানো হচ্ছে—ইরানের সঙ্গে এই যুদ্ধ নাকি বাইবেলে বর্ণিত ‘শেষ সময়’ বা ‘আর্মাগেডন’-এর সূচনা ডেকে আনতে পারে।
এ ধরনের বক্তব্য সামনে আসার পর যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক মুসলিম নাগরিক অধিকার সংগঠন কাউন্সিল অন আমেরিকান-ইসলামিক রিলেশন্স তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে। সংস্থাটি পেন্টাগনের এই ভাষাকে ‘বিপজ্জনক’ ও ‘ইসলামবিদ্বেষী’ বলে উল্লেখ করে দাবি করেছে, এভাবে যুদ্ধকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে তুলে ধরে ইরানে বেসামরিক নাগরিকদের হত্যাকে ন্যায্যতা দেওয়ার চেষ্টা করা হচ্ছে।
গত শনিবার থেকে শুরু হওয়া ধারাবাহিক বিমান হামলার প্রেক্ষাপটে মার্কিন ও ইসরায়েলি নেতাদের কিছু বক্তব্যও বিতর্ক তৈরি করেছে। একটি অভিযোগে বলা হয়েছে, এক মার্কিন কমান্ডার তার ইউনিটকে বলেছেন যে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পকে নাকি যিশু ‘অভিষিক্ত’ করেছেন ইরানে যুদ্ধের আগুন জ্বালাতে, যা যিশুখ্রিষ্টের পৃথিবীতে প্রত্যাবর্তনকে ত্বরান্বিত করবে।
এদিকে ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহু তোরাহ ধর্মগ্রন্থ থেকে উদ্ধৃতি দিয়ে ইরানকে প্রাচীন বাইবেলীয় শত্রু ‘আমালেক’-এর সঙ্গে তুলনা করেছেন। তিনি বলেন, ‘আমালেক তোমাদের সঙ্গে যা করেছিল তা স্মরণ কর এবং সেই অনুযায়ী কাজ কর।’ বিশ্লেষকদের মতে, গাজায় সামরিক অভিযানের সময়ও একই ধরনের বয়ান ব্যবহার করা হয়েছিল।
মার্কিন প্রশাসনের কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা এই সংঘাতকে কেবল ভূরাজনৈতিক বিরোধ নয়, বরং ‘সভ্যতার লড়াই’ হিসেবেও তুলে ধরছেন। পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও ইরান সরকারকে ‘উগ্র ধর্মীয় উন্মাদ’ বলে আখ্যা দিয়েছেন। প্রতিরক্ষামন্ত্রী পিট হেগসেথও দাবি করেছেন যে ইরান ‘ভবিষ্যদ্বাণীমূলক ইসলামী বিভ্রমে’ আচ্ছন্ন।
সিএআইআর বলছে, এ ধরনের মন্তব্য শিয়া সম্প্রদায়ের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সরাসরি কটাক্ষ। অন্যদিকে ইসরায়েলে নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূত মাইক হাকাবি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ইসরায়েল পুরো মধ্যপ্রাচ্য দখল করলেও সমস্যা নেই, কারণ বাইবেল অনুযায়ী এই ভূমি তাদের জন্য প্রতিশ্রুত।
বিশ্লেষকদের মতে, যুদ্ধকে ধর্মীয় ভাষায় ব্যাখ্যা করার পেছনে কৌশলগত কারণও রয়েছে। যুক্তরাজ্যের ডারহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক জোলিয়ন মিচেল এবং কাতারের নর্থওয়েস্টার্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইব্রাহিম আবুশরিফ মনে করেন, সংঘাতকে ‘পবিত্র যুদ্ধ’ হিসেবে উপস্থাপন করলে জনগণের নৈতিক সমর্থন পাওয়া সহজ হয় এবং জটিল আঞ্চলিক সমস্যাকে ‘সৎ বনাম অসৎ’-এর সরল কাঠামোয় তুলে ধরা যায়।
আবুশরিফ সতর্ক করে বলেছেন, যখন কোনো যুদ্ধ পবিত্র ভাষায় রূপ পায়, তখন রাজনৈতিক সমঝোতার পথ সংকুচিত হয়ে যায় এবং তা দীর্ঘমেয়াদি ধ্বংস ডেকে আনতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, ২০০১ সালের হামলার পর সাবেক মার্কিন প্রেসিডেন্ট জর্জ ডব্লিউ বুশের ‘ক্রুসেড’ শব্দ ব্যবহারের মতোই বর্তমানের ‘আর্মাগেডন’ বয়ানও মূলত কৌশলগত স্বার্থ রক্ষার অংশ।
সূত্র: আল জাজিরা।



