দিল্লি বা ইসলামাবাদ নয়, তারেক রহমানের হাত ধরে নতুন ভূরাজনীতির পথে বাংলাদেশ

২০২৪ সালের ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনা সরকারের পতনের ১৮ মাস পর বাংলাদেশে অনুষ্ঠিত হয়েছে উৎসবমুখর জাতীয় সংসদ নির্বাচন। ভোটযুদ্ধে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হয়েছে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)। দলটির চেয়ারম্যান তারেক রহমান-এর নেতৃত্বে গঠিত হয়েছে নতুন সরকার।
এই নির্বাচনের মাধ্যমে ভোটাররা এমন এক নেতৃত্বকে বেছে নিয়েছেন, যিনি অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন এবং আঞ্চলিক কূটনীতিতে নতুন ভারসাম্য আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। দীর্ঘ রাজনৈতিক অস্থিরতা ও দমন-পীড়নের পর বিএনপির এই বিজয়কে অনেক বিশ্লেষক গণঅভ্যুত্থানের ধারাবাহিকতা হিসেবেই দেখছেন। ২০২৪ সালের বিক্ষোভে প্রায় ১ হাজার ৪ শতাধিক মানুষের মৃত্যুর ঘটনায় জনমনে সঞ্চিত ক্ষোভ শেষ পর্যন্ত ক্ষমতার পালাবদলে রূপ নেয়।
দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম সময় ক্ষমতায় থাকা শেখ হাসিনা বর্তমানে দিল্লিতে অবস্থান করছেন। আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে তার অনুপস্থিতিতেই বিচার সম্পন্ন হয়ে মৃত্যুদণ্ড ঘোষণা করা হয়েছে। তবে তাকে ফেরত না দেওয়ার সিদ্ধান্তে নরেন্দ্র মোদি সরকারের সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কে নতুন টানাপড়েন সৃষ্টি হয়েছে।
ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনের ফলাফলকে অনেকেই দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক নিয়ন্ত্রণ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিরুদ্ধে জনরায়ের প্রতিফলন হিসেবে দেখছেন। শেখ হাসিনার আমলে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বজায় থাকলেও বিরোধী দমন, গুম ও বিচারবহির্ভূত হত্যার অভিযোগ ছিল নিয়মিত।
আঞ্চলিক কূটনীতিতে তার সরকার ভারতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়ায়। নিরাপত্তা সহযোগিতা, গোয়েন্দা তথ্য বিনিময় এবং সংযোগ ব্যবস্থায় অগ্রগতি ঘটলেও তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তিসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক ইস্যু অমীমাংসিত থেকে যায়। সীমান্তে হতাহতের ঘটনাও বন্ধ হয়নি। জ্বালানি খাতে ভারতের ওপর নির্ভরশীলতা বৃদ্ধি এবং কিছু অবকাঠামো প্রকল্পে স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
ক্ষমতা পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তী সরকার পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক স্বাভাবিক করার উদ্যোগ নেয়। দীর্ঘ বিরতির পর করাচির সঙ্গে সরাসরি ফ্লাইট চালু হয়, মন্ত্রী পর্যায়ের সফর পুনরায় শুরু হয় এবং বাণিজ্য বাড়ে। বিশ্লেষক স্মৃতি পট্টনায়ক মন্তব্য করেছেন, অতীতে ভারতের দিকে অতিরিক্ত ঝুঁকে থাকার পর এখন যেন উল্টো ভারসাম্যহীনতা তৈরি না হয়, সে বিষয়ে সতর্ক থাকা জরুরি।
তারেক রহমান ইতোমধ্যে দিল্লি ও ইসলামাবাদ—দুই দিক থেকেই শুভেচ্ছা বার্তা পেয়েছেন। তবে শেখ হাসিনাকে প্রত্যর্পণ প্রশ্নে ভারতের অবস্থান রাজনৈতিক অস্বস্তি তৈরি করেছে। দেশে ভারতবিরোধী মনোভাব থাকলেও বাণিজ্য, জ্বালানি ও আঞ্চলিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে বাস্তববাদী কূটনীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা যাচ্ছে না।
পর্যবেক্ষকদের মতে, এই রায় দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে নতুন বার্তা দিয়েছে। বাংলাদেশ একক কোনো শক্তির প্রভাববলয়ে সীমাবদ্ধ না থেকে ভারসাম্যপূর্ণ পররাষ্ট্রনীতি অনুসরণ করতে পারে—ভারত, চীন, যুক্তরাষ্ট্র ও পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক পুনর্গঠনের মধ্য দিয়ে।
সবশেষে, তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে—জাতীয় স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিয়ে বহুমুখী কূটনৈতিক পরিসর গড়ে তোলা, একক নির্ভরতা এড়িয়ে চলা এবং ঢাকার কণ্ঠস্বরকে আঞ্চলিক ও বৈশ্বিক অঙ্গনে আরও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করা।



