গণভোটে আপনারা ‘না’ ভোট দিবেন: জি এম কাদের

জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, বিদ্বেষ ও বিভাজনের রাজনীতিতে দেশের প্রায় ১৮ কোটি মানুষ আজ একে অপরের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে গেছে। তিনি অভিযোগ করেন, ইনসাফ ও সাম্যের কথা বলে দেশে চরম বৈষম্য ও দখলদারিত্বের এক অমানবিক বাস্তবতা তৈরি করা হয়েছে, যেখানে নিষ্ঠুরতাকে স্বাভাবিক হিসেবে মেনে নেওয়া হচ্ছে এবং মানুষ বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছে।
সোমবার (৯ ফেব্রুয়ারি) গভীর রাতে নিজের ও দলের ভেরিফায়েড ফেসবুক পেজে দেওয়া এক ভিডিও বার্তায় এসব কথা বলেন তিনি। এদিন বেশ কয়েকটি রাজনৈতিক দলের প্রধান বিটিভিতে জাতির উদ্দেশে ভাষণ দিলেও জাপা চেয়ারম্যানকে সেখানে দেখা যায়নি।
পরে ফেসবুক পোস্টে জি এম কাদের বলেন, “আমাদের প্রিয় মাতৃভূমি আজ যেন এক মৃত্যুপুরীতে পরিণত হয়েছে। দিনেদুপুরে মানুষ হত্যা ও লাশ পোড়ানোর ঘটনা ঘটছে। বিভিন্ন স্থানে সংখ্যালঘুদের বাড়িঘর ও দোকানপাটে লুটপাট, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের অভিযোগ উঠলেও রাষ্ট্র নির্বিকার ভূমিকা পালন করছে।”
তিনি আরও বলেন, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘোষণা দিয়েই বাড়িঘর ভাঙচুর ও আগুন দেওয়া হচ্ছে, অথচ কার্যকর কোনো প্রতিরোধ দেখা যাচ্ছে না। তার ভাষায়, এটি একটি ব্যর্থ রাষ্ট্রের পূর্বলক্ষণ।
দেশের বর্তমান অবস্থাকে ‘মুমূর্ষু’ আখ্যা দিয়ে জাপা চেয়ারম্যান বলেন, অর্থনীতিও মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে শত শত শিল্পকারখানা বন্ধ হয়ে গেছে, বেকারত্ব বাড়ছে এবং ব্যাংকের রিজার্ভের প্রকৃত অবস্থাও সাধারণ মানুষের কাছে অজানা। সীমান্ত পরিস্থিতি নিয়েও তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
নারীদের অবস্থান প্রসঙ্গে জি এম কাদের বলেন, “নারীরা আজ নিজ দেশেই পরবাসীর মতো জীবনযাপন করছে। শিল্প-সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের কণ্ঠরোধ করা হচ্ছে। এমনকি নারীদের শিক্ষা ও কর্মক্ষেত্রে চলাচলও আজ নিরাপদ নয়।”
এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট চেয়ে তিনি বলেন, জাতীয় পার্টি এমন একটি বাংলাদেশ গড়তে চায়, যেখানে নারীকে পোশাকের কারণে হেনস্তা হতে হবে না, শিক্ষককে শিক্ষার্থীর হাতে লাঞ্ছিত হতে হবে না এবং ভিন্নমতের মানুষ বা শিল্পীদের কণ্ঠরোধ করা হবে না। প্রত্যেক নাগরিকের সমান অধিকার ও মর্যাদা নিশ্চিত করাই তাদের লক্ষ্য।
এবারের নির্বাচন প্রসঙ্গে জি এম কাদের বলেন, দেশে মূলত দুটি পক্ষ রয়েছে—একটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনা ও ১৯৭১-এর আদর্শের পক্ষে, অন্যটি সেই আদর্শবিরোধী শক্তি। তার দাবি, জাতীয় পার্টিকে লাঙ্গল প্রতীকে ভোট দেওয়া মানে গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনাকে পুনঃপ্রতিষ্ঠা করা।
তিনি দাবি করেন, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আন্দোলনে তিনি ব্যক্তিগতভাবে সম্পৃক্ত ছিলেন এবং জাতীয় পার্টিও দলগতভাবে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেছে। ওই আন্দোলনে দলের দুই কর্মী শহীদ হয়েছেন এবং বহু নেতাকর্মী মামলা ও নির্যাতনের শিকার হয়েছেন বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জি এম কাদের বলেন, জুলাই আন্দোলনের শহীদ ও নির্যাতিতদের যথাযথ মূল্যায়ন এবং তাদের স্বপ্ন বাস্তবায়নে জাতীয় পার্টি অঙ্গীকারাবদ্ধ। তবে রাষ্ট্র ও সংবিধান সংস্কার অবশ্যই স্বচ্ছ ও সংবিধানসম্মত প্রক্রিয়ায়, নির্বাচিত সংসদ ও জনগণের অংশগ্রহণে হতে হবে বলে তিনি মত দেন।
আসন্ন গণভোট প্রসঙ্গে ‘না’ ভোট দেওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর পূর্বনির্ধারিত এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য অস্বচ্ছ ও বেআইনি প্রক্রিয়ায় যেসব সংস্কার প্রস্তাব আনা হয়েছে, তা গ্রহণযোগ্য নয়। তার অভিযোগ, বিভ্রান্তিকর চারটি প্রশ্নের আড়ালে সংবিধানের বড় ধরনের পরিবর্তন লুকিয়ে রাখা হয়েছে।
দেশ বর্তমানে এক সংকটময় সময় পার করছে উল্লেখ করে জি এম কাদের বলেন, সংবিধান নিয়ে প্রতারণা ও সামাজিক বন্ধন ভেঙে পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে, যা দেশকে সংঘাত ও অস্থিরতার দিকে ঠেলে দিতে পারে।



