
দেশে উন্নয়ন হলেও বৈষম্য বাড়ছে। বৈষম্য কমাতে হলে স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান অর্থাৎ ইউনিয়ন পরিষদ,পৌরসভা,উপজেলা পরিষদ,সিটি করপোরেশন ও জেলা পরিষদে বরাদ্দ বাড়ানোর বিকল্প নেই। এ বরাদ্দ কমপক্ষে উন্নয়ন বাজেটের ৫ শতাংশ হওয়া উচিত। পাশাপাশি বিকেন্দ্রীকরণ নীতি প্রণয়ন ও তার আলোকে স্থানীয় সরকারের জন্য সমন্বিত আইন প্রণয়নে উদ্যোগ গ্রহণ করতে হবে।
গ্রামীণ নারীর সংখ্যা ৫ কোটি ৩০ লাখ। গ্রামীণ নারীর বড় অংশই প্রান্তিক,দরিদ্র ও ভূমিহীন। নভেল করোনাভাইরাস ও লকডাউন নারীর এই প্রান্তিকতা গভীরতর করেছে।
নিম্ন মজুরি ও অপ্রাতিষ্ঠানিক খাতে ভুগতে থাকা যুব নারী কর্মীরাই মহামারীতে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। নারী দিনমজুরদের বড় অংশ কর্মহীন হয়ে দুর্বিষহ জীবন কাটিয়েছেন এবং কাটাচ্ছেন।
স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানে নারী ও যুব বান্ধব বাজেট পর্যালোচনা বিষয় নিয়ে বাংলা টিভির রিপোর্টার মোঃ মাসুদ রানার সাথে একান্ত কথা বলেছেন, জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা স্টাডিজ বিভাগের অধ্যাপক মোঃ মিজানুর রহমান।
মাসুদ: স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠানের বাজেটে নারী ও শিশুদের জন্য আলাদা বরাদ্দ রাখা হয়েছে কি-না পর্যালোচনা?
মিজানুর রহমান: নারী,যুব ও শিশুদের বিষয়টি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। গ্রামীণ নারী ও শিশুদের প্রতি বৈষম্য রোধে বাজেটে সরাসরি গুরুত্ব দিয়ে আলাদা বরাদ্দ দেয়া প্রয়োজন। বিশেষ করে কোভিডের চলমান প্রভাবে গ্রামীণ নারী ও শিশুরা ক্ষতিগ্রস্ত।
গবেষণায় দেখা গেছে নতুনভাবে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ দারিদ্রের তালিকায় যুক্ত হয়েছে যার বেশিরভাগই নারী ও শিশু। তাই এখনই তাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য নতুন প্রজেক্ট নেয়া ও তা বাস্তবায়ন করা জরুরী। বিশেষ করে স্থানীয় সরকারের মাধ্যমে এই উদ্যোগ গ্রহণ করলে তা বাস্তবায়ন আরও সহজ হবে।
আর এসব প্রান্তিক মানুষের সমস্যা ও মতামত বাজেট প্রণয়নের পূর্বেই যদি বাজেট প্রণয়ন প্রক্রিয়ায় উপস্থাপনের সুযোগ করে দেয়া হয় তাহলে একটি জনমুখী নারী ও শিশু বান্ধব বাজেট প্রণীত হবে যা বৃহত্তর কল্যাণ নিশ্চিত করবে।
মাসুদ: বিগত অর্থ বছরে যুব ও নারীদের জন্য বিশেষ কোন কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা হয়েছে কি-না?
মিজানুর রহমান: নারী ও শিশু মন্ত্রণালয় এ ২০২১-২২ অর্থ বছরে বরাদ্দ দেয়া হয় ৪১৯১ কোটি টাকা যদিও সরাসরি গ্রামীণ নারী ও শিশুদের বিষয়ে কিছু বলা হয় নি। বাজেট বক্তৃতায় নারীর ক্ষমতায়নের কথা বলা হলেও তা বাস্তবায়নের জন্য কোন কোন খাতে কত বরাদ্দ দেয়া হয়েছে,কোথায় আছে তা পরিষ্কার করে কিছু বলা হয়নি। বয়স্ক ভাতা,বিধবা ভাতা ও কিছু নগদ সহায়তা ছাড়া অন্য কোনো বাস্তবমুখী পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি।
২০১৯-২০২o অর্থ বছরে জেন্ডার বাজেট প্রণয়ন করা হলেও ২০২০-২১ এবং ২০২১-২২ এ জেন্ডার বাজেট করা হয়নি। ফলে কোন প্রকল্প বা কর্মসূচী কত বরাদ্দ পাচ্ছে তা অস্পষ্ট থেকে যাচ্ছে। অবশ্য সাম্প্রতিক সময়ের আশ্রায়ন প্রকল্প একটি ভালো উদ্যোগ হলেও কতটুকু সুফল দেবে তা ভবিষ্যতে বোঝা যাবে। এছাড়া শিশু দিবাযত্ন আইন ২০২১ প্রণয়ন করা হয়েছে যা শীঘ্রই সংসদে পাশ হবে বলে বাজেট বক্তৃতায় বলা হয়েছে।
মাসুদ: সিটি কর্পোরেশনের বাজেট নারী ও যুব বান্ধব কি না তা পর্যালোচনা সাপেক্ষে বাজেট বাস্তবায়নের সার্বিক দিক পর্যালোচনা করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করা।
মিজানুর রহমান: সিটি করপোরেশনের বাজেটে নারী ও শিশুদের জন্য তেমন জোরালো কোনো পদক্ষেপের কথা বলা হয়নি। বরং দিন দিন বড় বড় শহরগুলোতে নারী ও শিশুদের সুযোগ সুবিধা কমে যাচ্ছে। নারী ও শিশুদের নিরাপত্তা বিঘ্নিত হচ্ছে। শিশুদের চিকিৎসা ও খেলাধুলার ব্যবস্থা আরও বাড়ানো দরকার। নারীদের কাজের ক্ষেত্র তৈরি করা,যাতায়াতের সু-ব্যবস্থা ও নিরাপত্তার বিষয়টি আরও গুরুত্ব দেয়া দরকার।
নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা বর্তমানে বিশ্বব্যাপী সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত। এসব সহিংসতার ফলে তাদের শারিরীক ও মানসিক ক্ষতি ছাড়াও সামাজিক ও আর্থিক ক্ষতি হয়ে থাকে। উন্নয়নশীল দেশ সমুহে এসব সহিংসতার বেশিরভাগ ঘটে থাকে পারিবারিক পরিমন্ডলে। সময়ের সাথে সাথে সহিংসতার ধরণের পরিবর্তন হচ্ছে। বর্তমানে নারী ও শিশুরা শুধুমাত্র ঘরেই নয় বাইরেও সহিংসতার শিকার হচ্ছে।
পরিশেষ: বর্তমানে স্থানীয় সরকার বাজেটে নারী ও শিশুর জন্য আলাদা ভাবে বাজেট রাখা হলেও তা নিতান্তই কম যেই হারে নারী ও শিশু আজকের সমাজে ও প্রতিনিয়ত নির্যাতিত হচ্ছে তবুও বর্তমান সরকারের আমলে নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতা দূরীকরণে জাতিসংঘের প্রচারভিযান চলছে। নারী ও শিশুকে দক্ষ মানবশক্তিতে রুপান্তর করার লক্ষে পরিবারে ও সমাজে নারীর সুরক্ষা বাস্তবায়ন করতে হবে। তবে নারী ও শিশুর নির্যাতনের বিচার কার্যে ক্ষতিপূরণ দাবি সিদ্ধান্তে নেয়া হয়েছে।
বিগত অর্থ বছরে যুব ও নারীর জন্য বিশেষ কোন কার্যব্যবস্থা বাস্তবায়ন না হলে ও কিছু জিনিস উল্লেখযোগ্য যেমন- নারী ও যুব ক্ষমতায়নের জন্য কর্মদক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে নারীর নেতৃত্ব বৃদ্ধির লক্ষ্যে সুযোগ সৃষ্টি করা এবং সমাজে নেতৃস্থানীয় হিসেবে তাদের গড়ে তুলার লক্ষ্যে সমাজে নারী ও পুরুষের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিতকরণ। তবে সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ বৃদ্ধিতে বিভিন্ন কমিটিতে নারীর অন্তর্ভুক্তি নিশ্চিতকরণ করতে হবে।
প্রতি বছরই অর্থনৈতিক বাজেট প্রণয়নের পর বিভিন্ন দিক থেকে প্রশ্নবিদ্ধ হয়। মূলত বাজেট প্রণয়নে সকল স্তরের উপর তাদের নিজস্ব গুরুত্ব দিয়ে বাজেট প্রণয়ন করা প্রয়োজন। বর্তমান বিশ্বে প্রায় এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যা নারী ও যুবক তাদের দিয়ে সুষ্ঠু কার্যপরিচালনা করার জন্য তাদের কে গুরুত্বপূর্ণ পদে আসীন ও তাদের দিয়ে সম্পুরক কার্য সম্পাদন করার জন্য বাজেটে তাদের উপর একটা বিশেষ নজরদারির প্রয়োজন।
উন্নত বিশ্বে একটা কর্মউদ্যোগী জনশক্তিকে বিভিন্ন প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কাজে মনোনিবেশ করানো হয় এতে করে উৎপাদনশীল জনশক্তিতে দেশ পরিণত হয়। আমাদের প্রতিটা সিটি কর্পোরেশনে সাধারণত যেই বাজেট গুলা হয় তা নিতান্তই আলোচনাসাপেক্ষ বিশেষ বিশেষ দৃষ্টিকোন থেকে অনেক কিছুতে বাজেট প্রণয়ন হলেও নারী ও যুব উন্নয়ণে তেমন কোনো কার্যকরী পদক্ষেপ নেই। তবে বর্তমানে উপজেলা ভিত্তিক বিভিন্ন কারিগরী শিক্ষা ও বিভিন্ন ট্রেনিং সেন্টারের ব্যবস্থা করা হয়েছে যাতে করে তারা দেশের উন্নয়ন মূলক কাজে অংশগ্রহণ করতে পারে।
বাংলা টিভি/ মাসুদ রানা/ এস



