স্টেশনে যাত্রীদের পানি পান করিয়ে ছেলের স্মৃতি খুঁজে ফেরেন মুন্নু সেখ

বাংলা টিভি ডেস্ক: “টাকা ছাড়া ঠান্ডা পানি কে খাবেন? টিউবওয়েলের একেবারে ফ্রেশ ঠান্ডা পানি”—এভাবেই উচ্চস্বরে ডাকতে ডাকতে হাতে পানিভর্তি বালতি নিয়ে প্ল্যাটফর্মে ছুটে যান মুন্নু শেখ। ট্রেনের জানালা দিয়ে তৃষ্ণার্ত যাত্রীদের হাতে তিনি তুলে দেন ঠান্ডা পানির বোতল।
কালুখালী স্টেশনের এই দৃশ্য এখন অনেক যাত্রীর কাছে পরিচিত। পেশায় চটপটি বিক্রেতা হলেও মুন্নু শেখ প্রতিদিন দুপুরে রাজশাহীগামী নকশিকাঁথা মেইল ট্রেন স্টেশনে পৌঁছানোর আগেই নিজের দোকান বন্ধ করে পানির বোতল সংগ্রহে ব্যস্ত হয়ে পড়েন। এরপর ট্রেন থামলেই বগি বগি ঘুরে যাত্রীদের হাতে বিনামূল্যে পানি তুলে দেন তিনি।
স্থানীয় ও যাত্রীদের ভাষ্য অনুযায়ী, ২০১৮ সালে মুন্নু শেখের ৯ বছর বয়সী ছেলে সবুজ শেখ ব্লাড ক্যানসারে আক্রান্ত হয়। চিকিৎসার জন্য নিয়মিত রাজশাহী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে যাতায়াত করতে হতো তাদের এই ট্রেনেই। অনেক সময় ছেলের জন্য এক বোতল পানি কেনার সামর্থ্যও থাকত না তার।
দীর্ঘ লড়াইয়ের পর ২০২০ সালে মারা যায় ছোট্ট সবুজ। সন্তানের মৃত্যু মুন্নুকে ভেঙে দিলেও তাকে থামাতে পারেনি। ছেলের স্মৃতিকে ধারণ করেই তিনি প্রতিজ্ঞা করেন—যতদিন বেঁচে থাকবেন, ততদিন ট্রেনে কোনো তৃষ্ণার্ত মানুষকে পানি ছাড়া থাকতে দেবেন না।
সেই প্রতিজ্ঞার অংশ হিসেবেই তিনি প্রতিদিন টিউবওয়েলের পানি সংগ্রহ করে বোতলে ভরে রাখেন। পরে ট্রেন আসার সঙ্গে সঙ্গে প্ল্যাটফর্মে ছুটে গিয়ে যাত্রীদের হাতে পানির বোতল তুলে দেন।
যাত্রী সোহেল রানা বলেন, “ট্রেনে এমন মানবিক উদ্যোগ সত্যিই বিরল। উনার দেওয়া পানি পান করে তৃষ্ণা মিটিয়েছি, ভালো লেগেছে।”
আরেক যাত্রী রোজি সিদ্দিকী বলেন, “যাত্রাপথে বিনামূল্যে পানি দেওয়া সত্যিই প্রশংসনীয়। এটা শুধু সেবা নয়, মানবিকতার দৃষ্টান্ত।”
মুন্নু শেখ বলেন, “যখনই কারও হাতে পানি দিই, আমার ছেলের কথা মনে পড়ে যায়। সবুজের স্মৃতিই আমাকে এই কাজ চালিয়ে যেতে অনুপ্রেরণা দেয়।”
তিনি জানান, প্রতিদিন বোতল সংগ্রহ করে ধুয়ে পরিষ্কার করে টিউবওয়েলের ঠান্ডা পানি ভরে রাখেন। গত প্রায় ছয় বছর ধরে তিনি এই সেবামূলক কাজ করে আসছেন।
আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতি হলেও এতে কোনো আক্ষেপ নেই জানিয়ে তিনি বলেন, মানুষের দোয়া আর ভালোবাসাই তার সবচেয়ে বড় পাওয়া।



