ভারত-বাংলাদেশ পানি বণ্টন অচলাবস্থায় চীনের দিকে ঝুঁকছে ঢাকা

আন্তর্জাতিক ডেস্ক: ভারতের সঙ্গে যৌথ নদীগুলোর পানিবণ্টন নিয়ে দীর্ঘদিনের অচলাবস্থার কোনো দৃশ্যমান অগ্রগতি না হওয়ায় বাংলাদেশের নদী ব্যবস্থাপনায় নতুন কৌশল গ্রহণের আলোচনা জোরদার হয়েছে। কূটনৈতিক পর্যায়ে বছরের পর বছর আলোচনার পরও সমাধান না আসায় এখন অভ্যন্তরীণ অবকাঠামো উন্নয়ন ও বিকল্প সহযোগিতার দিকে ঝুঁকছে ঢাকা, যার মধ্যে চীনের সঙ্গে অংশীদারত্বও গুরুত্ব পাচ্ছে।
নদী গবেষক ও নীতিনির্ধারকদের মতে, উজানে পানি প্রত্যাহার ও বিভিন্ন বাঁধ নির্মাণের কারণে বাংলাদেশের নদীগুলোর স্বাভাবিক প্রবাহ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। বিশেষ করে শুষ্ক মৌসুমে পানির ঘাটতি, লবণাক্ততা বৃদ্ধি এবং কৃষি ও জীববৈচিত্র্যে নেতিবাচক প্রভাব স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। সরকারি গবেষণা সংস্থার এক সমীক্ষায় বলা হয়েছে, দেশে কয়েক ডজন নদী ইতিমধ্যে শুকিয়ে গেছে বা অস্তিত্ব সংকটের মুখে রয়েছে।
এই প্রেক্ষাপটে সরকার বড় আকারের নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্প এগিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে ২.৮ বিলিয়ন ডলারের ‘পদ্মা ব্যারাজ’ প্রকল্প এবং চীন-সমর্থিত ‘তিস্তা মেগা প্রকল্প’। পদ্মা ব্যারাজের মাধ্যমে বর্ষার অতিরিক্ত পানি সংরক্ষণ করে শুষ্ক মৌসুমে দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের পানিসংকট ও লবণাক্ততা কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে। অন্যদিকে তিস্তা প্রকল্পে নদীভাঙন রোধ ও কৃষিজমি সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশের পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, ১৯৭৫ সালে ফারাক্কা ব্যারেজ চালুর আগে গঙ্গা-পদ্মা নদীতে শুষ্ক মৌসুমে গড় পানিপ্রবাহ ছিল তুলনামূলকভাবে অনেক বেশি, যা পরবর্তী সময়ে উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় বলে দাবি করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, এই পরিবর্তন দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে পরিবেশগত ভারসাম্যহীনতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যে ৫০টির বেশি অভিন্ন নদী থাকলেও গঙ্গা ও তিস্তা ইস্যু দীর্ঘদিন ধরে অমীমাংসিত রয়ে গেছে। ২০১১ সালে তিস্তা পানিবণ্টন চুক্তি চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছালেও তা বাস্তবায়ন হয়নি। আগামী সময়ে গঙ্গা চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ায় নতুন করে আলোচনার সুযোগ তৈরি হলেও এখনো সমাধান অনিশ্চিত।
ঢাকার কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক মহলে ধারণা, এই দীর্ঘ অচলাবস্থার কারণে বাংলাদেশ ধীরে ধীরে বিকল্প অংশীদার হিসেবে চীনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, নদী ব্যবস্থাপনা প্রকল্পে চীনের সম্পৃক্ততা আঞ্চলিক ভূরাজনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করছে এবং তা প্রতিবেশী ভারতের জন্যও কৌশলগতভাবে সংবেদনশীল বিষয় হয়ে উঠেছে।
তবে পরিবেশবিদরা সতর্ক করে বলছেন, বড় অবকাঠামোগত প্রকল্প যথাযথ জলপ্রবাহ বিশ্লেষণ ছাড়া বাস্তবায়ন করা হলে তা ডেল্টা অঞ্চলের পরিবেশের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে। তাদের মতে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ নিশ্চিত না হলে এসব প্রকল্প কাঙ্ক্ষিত সুফল নাও দিতে পারে।
বিশ্লেষকদের মতে, আন্তর্জাতিক নদী ব্যবস্থাপনায় স্থায়ী সমাধান কেবল অবকাঠামো নির্ভর নয়; বরং টেকসই কূটনৈতিক সমঝোতা ও আঞ্চলিক সহযোগিতার ওপরই এর দীর্ঘমেয়াদি সফলতা নির্ভর করবে।
সূত্র: নিক্কেই এশিয়া



