পদত্যাগ করতে নারাজ মমতা, না করলে কী হবে

বাংলা টিভি ডেস্ক: পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনে বড় ব্যবধানে পরাজয় এবং টানা ১৫ বছরের শাসনের অবসান ঘটার পর নাটকীয় মোড় নিলেন তৃণমূল কংগ্রেস নেত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বুধবার (৫ মে) এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি সাফ জানিয়ে দিয়েছেন যে, তিনি এই নির্বাচনে হারেননি এবং বর্তমানে পদত্যাগ করার কোনো পরিকল্পনা তার নেই।
মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নির্বাচনের ফলাফলকে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ত রায় হিসেবে মানতে অস্বীকার করে একে বিজেপির ‘লুট করা ম্যান্ডেট’ বলে অভিহিত করেছেন। সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, “আমি হারিনি, তাই রাজভবনে যাওয়ার বা পদত্যাগপত্র জমা দেওয়ার কোনো প্রশ্নই ওঠে না।” তার দাবি, নির্বাচনে অন্তত ১০০টি আসন পরিকল্পিতভাবে ‘চুরি’ করা হয়েছে।
সংবাদ সম্মেলনে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় সরাসরি নির্বাচন কমিশন ও কেন্দ্রীয় সরকারের বিরুদ্ধে তোপ দাগেন। তিনি অভিযোগ করেন, নির্বাচন কমিশন নিরপেক্ষতা হারিয়ে বিজেপির হয়ে ‘নোংরা খেলা’ খেলেছে। তার ভাষায়, “আসল প্রতিদ্বন্দ্বী বিজেপি ছিল না, ছিল নির্বাচন কমিশন। এভাবেই তারা মহারাষ্ট্র, হরিয়ানা, বিহার এবং এখন পশ্চিমবঙ্গ থেকে নির্বাচন চুরি করেছে।”
নিজের শারীরিক লাঞ্ছনার অভিযোগ তুলে ৭১ বছর বয়সি এই নেত্রী বলেন, ভোট গণনাকালে তিনি আক্রমণের শিকার হয়েছেন। তার পেটে ও পিঠে লাথি মারা হয়েছে এবং গণনাকেন্দ্রের সিসিটিভি ক্যামেরা বন্ধ করে তাঁকে ধাক্কা দিয়ে বের করে দেওয়া হয়েছে বলে তিনি দাবি করেন। একজন নারী হিসেবে তাঁর সাথে চরম দুর্ব্যবহার করা হয়েছে বলেও তিনি উল্লেখ করেন।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে বিস্তারিত কিছু না বললেও মমতা জানান, ‘ইন্ডিয়া’ ব্লকের জাতীয় পর্যায়ের নেতারা তার সাথে যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের পূর্ণ সমর্থন তার প্রতি রয়েছে। তবে নিজের নির্বাচনী এলাকা ভবানীপুরে ১৫ হাজারেরও বেশি ভোটে শুভেন্দু অধিকারীর কাছে পরাজিত হওয়ার বিষয়ে কোনো সরাসরি মন্তব্য করেননি তিনি। রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, মমতার এই অবস্থান রাজ্যে এক নতুন ধরনের সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক জটিলতার জন্ম দিতে পারে।
দত্যাগ না করলে?
আনন্দবাজার পত্রিকা বলছে, সোমবার দুপুরেই ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়া যখন শুরু করেছিল তখনই কৌতূহল তৈরি হয়েছিল, মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় কখন লোকভবনে যাবেন? কখন ইস্তফা দেবেন? কারণ সেটাই রীতি। মমতার আগের ক্ষমতাচ্যুত মুখ্যমন্ত্রীরা তেমনই করে এসেছেন।
মমতা যখন সোমবার রাতে কলকাতার সাখাওয়াত মেমোরিয়াল স্কুলের ভোট গণনা কেন্দ্র থেকে বের হলেন, অনেকেই তখন ভেবেছিলেন, এর পরে তিনি লোকসভবনে গিয়ে রাজ্যপালের হাতে ইস্তফাপত্র তুলে দেবেন। কিন্তু মমতার কনভয় চলে যায় কালীঘাটে তার বাড়ির পথে।
ভোটে হারার পর মুখ্যমন্ত্রী যদি আনুষ্ঠানিকভাবে পদত্যাগ না করেন, তখন কী হবে সে বিষয়ে ভারতের সংবিধানে কিছু বলা নেই। কারণ এমন পরিস্থিতির যে উদ্ভব হতে পারে, তা কেউ ভাবেননি।
তবে সংবিধান বিশেষজ্ঞেরা বেশ কিছু ধারণার কথা বলছেন, যা অতীতে কোনো না কোনো রাজ্যে ঘটেছে। কিন্তু ভোটে হেরে যাওয়ার পরেও বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা না দেওয়ার নজির দেশে নেই। ফলে মমতা শেষ পর্যন্ত ইস্তফা না দিলে ভারতের সংসদীয় গণতন্ত্রের ইতিহাসে এক নতুন নজির তৈরি হবে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হচ্ছে আগামী ৭ মে বৃহস্পতিবার। ইস্তফা না দিলে আনুষ্ঠানিকভাবে ওই দিন পর্যন্ত মমতাই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থাকবেন। কিন্তু ৭ মে পার হলেই তার মুখ্যমন্ত্রীর পদ থাকবে না। ইস্তফা না দিলেও নামের আগে জুড়ে যাবে ‘প্রাক্তন’ মুখ্যমন্ত্রী।
আনন্দবাজারের খবরে বলা হয়, ভোটে হারলে রাজ্যপালের সঙ্গে দেখা করে বিদায়ী মুখ্যমন্ত্রীর ইস্তফা দেওয়াটা ‘নিয়ম’নয়। এটি সাধারণভাবে রেওয়াজ, রীতি বা সাংবিধানিক শিষ্টাচার।
যেমন পনের বছর আগে ২০১১ সালের ১৩ মে দুপুর নাগাদ ভোটের ফল স্পষ্ট হওয়ার পরেই তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য রাজভবনে গিয়ে সে সময়কার রাজ্যপাল গোপালকৃষ্ণ গান্ধীর সঙ্গে দেখা করে ইস্তফাপত্র তুলে দিয়েছিলেন।
শুধু তাই নয়, তিনি রাজভবন থেকে সরকারি গাড়ি ছেড়ে দিয়ে আলিমুদ্দিন স্ট্রিটের পার্টি অফিসে গিয়েছিলেন দলের গাড়িতে চেপে।
পদত্যাগ না করলে মমতাকে বরখাস্তের আহ্বান
নির্বাচনে হেরেও মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ না করলে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে বরখাস্ত করতে পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপালকে আহ্বান জানিয়েছেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা।
মঙ্গলবার এনডিটিভির প্রধান সম্পাদক রাহুল কানওয়ালকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, মমতা ব্যানার্জি যদি পদত্যাগ না করেন, তাহলে তাকে বরখাস্ত করুন। বাংলার মানুষ তাকে অনেক দিন সহ্য করেছে।
এনডিটিভি লিখেছে, তৃণমূল নেত্রী মমতা মুখ্যমন্ত্রীর পদ থেকে সরে না দাঁড়ালে রাজ্যে রাষ্ট্রপতি শাসন জারির সম্ভাবনা নিয়ে গুঞ্জন তৈরি হলেও নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তারা বলছেন, এর প্রয়োজন নাও হতে পারে। কারণ বিধানসভার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে বিজয়ী দল যদি সরকার গঠনের দাবি জানায় এবং রাজ্যপাল তাদের আমন্ত্রণ জানান, তাহলে এই সাংবিধানিক সংকটের সমাধান সম্ভব।
সোমবার প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বক্তৃতা থেকে ইঙ্গিত মিলেছে, বিজেপি ৯ মে রবীন্দ্রজয়ন্তীর দিন শপথগ্রহণের কর্মসূচি করতে পারে। রাজ্য বিজেপির নেতাদের কথাতেও তেমই ইঙ্গিত পাওয়ার কথা বলেছে আনন্দবাজার।



